মৃত নদীগুলোকে জীবিত করা হবে

মৃত নদীগুলোকে জীবিত করা হবে

ড্রেজিং কার্যক্রম হবে স্বচ্ছ, দৃশ্যমান ও সমন্বিত
* আলাপচারিতায় নৌ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী

রফিকুল ইসলাম সবুজ
রাজধানী ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যা এবং চট্টগ্রামের কর্ণফুলীসহ এর আশপাশের নদ-নদীগুলোর বেদখল হওয়া পাড় দখলমুক্ত করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনা ও নদীগুলোকে দৃষ্টিনন্দন করতে মহাপরিকল্পনা করা হচ্ছে। এক বছর থেকে ১০ বছর মেয়াদে কয়েকধাপে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এসব কথা বলেন।

সম্প্রতি নৌ মন্ত্রণালয়ে নিজ দপ্তরে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপ নৌ প্রতিমন্ত্রী বলেন, মহাপরিকল্পনার অর্থ হচ্ছে আমরা নদীকে রক্ষা করতে চাই। মরা নদীগুলোকে আমরা জীবিত করতে চাই। বাংলাদেশে যেসব নদী মরে গেছে বা দখল হয়ে গেছে সেগুলোকে খননের মাধ্যমে পুনরুদ্ধার করতে চাই। বুড়িগঙ্গাসহ অসংখ্য বড় নদীগুলোর যেসব শাখা দখল হয়ে গেছে সেগুলোকেও উদ্ধার করা হবে।

বিলুপ্ত নদ-নদীগুলো রাতারতি উদ্ধার করা সম্ভব নয় মন্তব্য করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এজন্য পরিকল্পনা অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। আর অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ হওয়ার পর নদী যেন পুনরায় দখল হতে না পারে সেজন্যও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। নদী রক্ষা কমিশনও কাজ করছে কোথায় নদী উদ্ধার করতে হবে।

তিনি বলেন, আগে নৌ মন্ত্রণালয় ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতা ছিল। এখন সমন্বয় করে নদী খনন করা হবে, সমন্বিত ড্রেজিং হবে। আগে ঠেকে গেলে বা নৌ চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে তখন ড্রেজিং হতো। এখন পরিকল্পনা অনুযায়ী ড্রেজিং হবে; যাতে নৌপথ সারা বছর সচল রাখার পাশাপাশি মরে যাওয়া নদীগুলো উদ্ধার করা যায়।

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আগে ড্রেজিং নিয়ে মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা ছিল। কোথায় ড্রেজিং হচ্ছে কেউ দেখতে পেতেন না। কাগজে-কলমে ড্রেজিং হতো- এমন অভিযোগও ছিল। তাই এখন ড্রেজিং কার্যক্রম হবে স্বচ্ছ ও দৃশ্যমান। আমরা মানুষকে দেখাবো যে কোথায় কোথায় ড্রেজিং হচ্ছে। আমরা যদি নদীকে রক্ষা করতে পারি, নৌপথ সচল রাখতে পারি তাহলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে জিডিপি’র হার ডাবল ডিজিটে (দ্বিগুণ) উন্নীত করা সম্ভব হবে।

নৌ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নৌপথ সৃষ্টি করা একটি চ্যালেঞ্জের কাজ। ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথ খনন করার সক্ষমতা আমাদের আছে। নৌপথ খননে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তরাও এগিয়ে আসছেন। আমরা ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথের নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে চাই। আমাদের নৌপথ ব্যবহার করে কোলকাতার মানুষ আসামে যেতে পারবে। কুড়িগ্রামের চিলমারী বন্দর হয়ে আমরা ভুটান, চায়না এবং ভারতের সঙ্গে যুক্ত হবো। আর নৌপথের সঙ্গে নদীবন্দরগুলোকেও যুক্ত করা হবে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে। আমরা ড্রেজিং করে নদীর নাব্যতা ফিরে আনবো।

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ঢাকার চারপাশের চারটি ও চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা ফিরে আনতে ও দূষণমুক্ত করতে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি নদীগুলো দখলমুক্ত করতে ইতোমধ্যেই টাস্কফোর্স গঠন করে দিয়েছেন। নদী নিয়ে মহাপরিকল্পনা করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে দখল হওয়া নদী ও খাল পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য উচ্ছেদ অভিযান চলছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে সাত শতাধিক নদী রয়েছে। আমরা সব নদী রক্ষা করতে চাই। ইতোমধ্যে নদী রক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছে। আমরা প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় নদী রক্ষা কমিটি গঠন করতে যাচ্ছি। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সমন্বয়ে গঠিত এই কমিটির সভাপতি থাকবেন জেলা প্রশাসক।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, জিয়াউর রহমানের আমলে রাজনৈতিকভাবেই নদীর পাড়ে স্থাপনা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের দুর্বলতার কারণেই নদীর পাড়ের জমি ব্যক্তি বা গোষ্ঠী দখল করেছে। আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব দিয়েই নদী-সমুদ্র রক্ষা করছে।

তিনি জানান, ইতোমধ্যেই ঢাকায় নদীর পাড়ে উচ্ছেদের পর ৫০ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। ঢাকার চারপাশের চারটি নদী ঘিরে প্রায় দেড় শ’ কিলোমিটার পায়ে হাঁটার রাস্তা নির্মাণ করা হবে। নদীর উন্নয়নে রাজধানীর চিত্রই পাল্টে যাবে।

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, নৌপথকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে- আগে কোনো সরকারই এটা ভাবতো না। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নদী রক্ষার জন্যই পৃথক নৌ মন্ত্রণালয় গঠন করেছিলেন। তিনি (বঙ্গবন্ধু) বলেছিলেন, “নদীমাতৃক বাংলাদেশ বাঁচাতে হলে নদী রক্ষা করতে হবে।” বঙ্গবন্ধু সেটা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তারপরে অন্য সরকারগুলো নদী রক্ষা ও নৌপথ উন্নয়নে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। একমাত্র শেখ হসিনার সরকারই নদী নিয়ে চিন্তা করেছে। নৌপথ উন্নয়নে পদক্ষেপ নিয়েছে।

নৌ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বিভিন্ন সংস্থায় দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, নৌযানের সার্ভে, রেজিষ্ট্রেশন ও নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে অনিয়ম দুর্নীতি হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করতে আমরা কার্যক্রমগুলোকে ডিজিটাল করছি। তারপরও কেউ দুর্নীতি করলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেবে।

Share