মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদযাপিত

মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদযাপিত

* মুক্তিযুদ্ধে বীর শহীদদের প্রতি জাতির বিনম্র শ্রদ্ধা
* শিশুদের সমৃদ্ধ-ভবিষ্যত নির্মাণের প্রত্যয় প্রধানমন্ত্রীর

নিজস্ব প্রতিবেদক
যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপিত হলো ৪৮তম মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও বিরোধীয় দলের নেতাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা সাভাবে

জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে বীর শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। শিশুদের জন্য সমৃদ্ধ-ভবিষ্যত নির্মাণে কাজ করার কথা জানালেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জনগণের ষোলো আনা মুক্তি পেতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করার ঘোষণা দিলেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। আর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বললেন, খালেদা জিয়াকে মুক্ত করাই এবারের স্বাধীনতা দিবসের অঙ্গীকার।

২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে ঢাকাসহ সারা দেশে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসটির সূচনা হয়। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। ফুল দেয়ার পর রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী বেশ কিছু সময় দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করেন। এ সময় বিউগলে বাজানো হয় করুণ সুর। গার্ড অব অনার দেয় সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকস দল।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, কেবিনেট সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য, মুক্তিযোদ্ধা, বিদেশি কূটনীতিক ও বিভিন্ন বাহিনীর প্রধানেরা।
প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর আওয়ামী লীগ সভাপতি হিসেবে দলীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন শেখ হাসিনা।
জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া, সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা রওশন এরশাদ, ঢাকার দুই মেয়র সাঈদ খোকন ও আতিকুল ইসলাম ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

এ ছাড়া দেশে অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিক, বিভিন্ন রাজনৈতিক- সামাজিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের জনগণ স্মৃতিসৌধে একাত্তরে শহীদ হওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়।

শিশুদের সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নির্মাণে
কাজ করছি: প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তাঁর সরকার একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করছে, যেখানে শিশুরা সুন্দর, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ জীবন যাপন করতে পারবে। তিনি বলেছেন, ‘আজকের শিশুরাই ভবিষ্যতে নেতৃত্ব দেবে। আমরা আমাদের শিশুদের সেভাবে গড়ে তুলতে চাই। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ও দেশকে ভালোবেসে তারা কাজ করবে।’ স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে মঙ্গলবার সকালে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে শিশু-কিশোর সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

শিশু-কিশোরদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তোমাদের দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। এটি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার বঙ্গবন্ধু-১ উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করেছে। সারা দেশে মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ চালু করেছে। শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক ও উপবৃত্তির ব্যবস্থা করেছে।

শিশুদের খেলাধুলা, শরীরচর্চা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘শুধু পড়ালেখাই যথেষ্ট নয়, শিশুদের ভালো স্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়ারও প্রয়োজন আছে। তাদের মেধা, মনন ও সৃজনশীলতা বিকশিত হতে হবে। তাদের একটি সুন্দর জীবন গড়ে তুলতে হবে। এটি আমাদের লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে আমরা সারা দেশে বিভিন্ন ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু করেছি।’

শেখ হাসিনা সন্ত্রাস, মাদক ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তাঁর সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি পুনরুল্লেখ করে বলেন, ‘সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও মাদকের হাত থেকে আমরা দেশকে মুক্ত করতে চাই।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি শিশু-কিশোর, অভিভাবক, ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃবৃন্দসহ সবাইকে আহ্বান জানাব, মাদক, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদের কুফল সম্পর্কে আমাদের শিশুদের জানাতে হবে এবং এর হাত থেকে শিশু-কিশোরদের রক্ষা করতে হবে।’

এ সময় প্রধানমন্ত্রী কার সন্তান কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে, বিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সে নিয়মিত যায় কিনা- এসব বিষয়ে লক্ষ্য রাখার জন্য অভিভাবক, সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের নজর রাখার আহ্বান জানান।
ঢাকা জেলা প্রশাসন সমাবেশটির আয়োজন করে। সমাবেশে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বক্তব্য দেন ঢাকার জেলা প্রশাসক আবু সালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খান।

বক্তব্যের আগে প্রধানমন্ত্রী জেলার বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের মনোজ্ঞ প্যারেড পরিদর্শন করেন। পরে তিনি বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের অভিবাদন গ্রহণ ও শিক্ষার্থীদের মনোমুগ্ধকর ডিসপ্লে উপভোগ করেন। অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক উপস্থিত ছিলেন।

ষোলো আনা মুক্তির জন্য
ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন: কামাল
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেছেন, সংবিধানে স্বাধীনতার লক্ষ্য সম্পর্কে বলা আছে, ষোলো আনা মুক্তি পেতে গেলে আমাদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করতে হবে। গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা ও শাসন ব্যবস্থা কার্যকর ও বাস্তবে রূপ দিতে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। মঙ্গলবার সকালে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে এসে তিনি এ কথা বলেন। ড. কামাল আরও বলেন, জনগণ সব ক্ষমতার মালিক। এ মালিকানা থেকে যদি কেউ তাদের বঞ্চিত করে, তবে তারা সংবিধানবিরোধী ও স্বাধীনতাবিরোধী কাজ করছে। কেউ যেন অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয় সেজন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করতে হবে।

শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন

বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করে তিনি বলেন, তিনি সবসময় বলতেন, ঐক্য ধরে রাখতে হবে। তার অসাধারণ নেতৃত্বেই জাতি একতা ধরে রাখতে পেরেছিল। ঐক্যফ্রন্টের এই শীর্ষনেতা বলেন, জনগণের ঐক্যকে সব শক্তির ভিত। সে শক্তি থেকে যারা আমাদের বঞ্চিত করতে চায়, তারা জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়।

আওয়ামী লীগ আবারও বাকশাল ফিরিয়ে আনতে চাইছে- বিএনপির করা এমন অভিযোগ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল বলেন, একনায়কতন্ত্র যেন না আসে সেটাই ঐক্যবদ্ধভাবে সবাইকে নিশ্চিত করতে হবে। আমরা তো বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সংবিধানে বহুদলীয় গণতন্ত্রের কথা লিখেছিলাম।

খালেদাকে মুক্ত করার
অঙ্গীকার: ফখরুলের
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, যেই গণতন্ত্রের জন্য মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, সেটিকে পুনরুদ্ধার এবং গণতন্ত্রের নেত্রী খালেদা জিয়াকে মুক্ত করাই এবারের স্বাধীনতা দিবসে বিএনপির অঙ্গীকার। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে যিনি সারাটা জীবন গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছেন, সেই নেত্রী খালেদা জিয়াকে আমরা মুক্ত করবো। মঙ্গলবার স্বাধীনতা দিবসের সকালে সাভারের স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে এসে সাংবাদিকদের সামনে এ কথা বলেন তিনি।

স্বাধীনতার চেতনা লুণ্ঠিত হয়েছে মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল বলেন, চরম দুর্ভাগ্য আজকে যে চেতনা ও আদর্শকে সামনে নিয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম, আজকে সে চেতনা ও আদর্শ সম্পূর্ণভাবে ভুলুণ্ঠিত হয়েছে। গণতন্ত্রকে হত্যা করে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার জন্য একটা চক্রান্ত প্রায় প্রতিষ্ঠা লাভ করতে চলেছে। স্বাধীনতার আদর্শকে পুনরুদ্ধার করার জন্য দেশবাসীকে শপথ নেওয়ার আহ্বান জানান বিএনপি মহাসচিব।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে শ্রদ্ধা নিবেদন

বিএনপি নেতাদের মধ্যে খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলামখান, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, এজেডএম জাহিদ হোসেন, নিতাই রায় চৌধুরী, আদুস সালাম, সিরাজউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খায়রুল কবির খোকন, শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, মফিকুল হাসান তৃপ্তি, অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ, সেলিম রেজা হাবিব, আবু আশফাক খন্দকার এই দুই কর্মসূচিতে ফখরুলের সঙ্গে ছিলেন।

অঙ্গসংগঠনের নেতাদের মধ্যে ছিলেন আনোয়ার হোসেইন, নুরুল ইসলাম খান নাসিম, আহসানউল্লাহ হাসান, মোরতাজুল করীম বাদরু, সুলতানা আহমেদ, হেলেন জেরিন খান, সাদেক আহমেদ খান ও আবুল কালাম আজাদ।
বিএনপি ছাড়াও য্বু দল, স্বেচ্ছাসেবক দল, উলামা দল, মহিলা দল, মৎস্যজীবী দল, ছাত্রদল, জাসাসসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের পক্ষ থেকে জিয়ার কবরে পুস্পস্তবক অর্পণ করা হয়।

Share