সুবর্ণচরে ধর্ষণ: ভয়ঙ্কর অপরাধের পুনরাবৃত্তি

সুবর্ণচরে ধর্ষণ: ভয়ঙ্কর অপরাধের পুনরাবৃত্তি

সম্পাদকীয়

গত বছর ডিসেম্বরে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের রাতে স্বামী- সন্তানকে বেঁধে রেখে এক গৃহবধূকে গণধর্ষণ ও নির্যাতন আমাদের যতটা ক্ষুব্ধ ও উদ্বিগ্ন করেছিল; একই উপজেলার আরেকটি ইউনিয়নে এই অপরাধের পুনরাবৃত্তি আমাদের তার চেয়ে বেশি স্তম্ভিত করেছে। আমাদের মনে আছে, ওই ঘটনা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। এর সঙ্গে জড়িতদের ইতিমধ্যে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তাদের যে রেহাই মিলবে না, তাও ইতিমধ্যে স্পষ্ট। তারপরও একই এলাকায় একই ধরনের অপরাধের দুঃসাহস কী করে হয়? অস্বীকার করা যাবে না যে, দেশে ধর্ষণসহ এ জাতীয় নারী নিপীড়নের ঘটনা কম নয়। কিন্তু নিছক ‘রাজনৈতিক’ বিরোধের কারণে কাউকে ধর্ষণের নজির খুব বেশি নেই। আমাদের মনে আছে, অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় কিশোরী পূর্ণিমা শীলকেও একইভাবে ‘রাজনৈতিক শিক্ষা’ দিতে চেয়েছিল ধর্ষকরা। মন্দের ভালো যে, অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উল্লাপাড়া এবং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সুবর্ণচরে ধর্ষণের বিচারের বাণী নিভৃতে কেঁদে ফেরেনি। কিন্তু সর্বসাম্প্রতিক এই ধর্ষণের ঘটনা প্রমাণ করে যে, কোনো ধর্ষণের ঘটনায় কেবল সংশ্নিষ্ট অপরাধীদের আইনের আওতায় এনেই দায়িত্ব শেষ হতে পারে না। আগের অভিজ্ঞতা থেকে পুলিশ দ্রুতই সক্রিয় হয়েছে এবং পাঁচজনকে আটক করেছে। আমরা দেখতে চাইবো, জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এমন অপরাধের পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে, সে ব্যাপারেও প্রশাসনকে সক্রিয় থাকতে হবে। আমরা এও দেখতে চাইবো, আক্রান্ত নারী ও তার পরিবারের পাশে সবাই দাঁড়িয়েছে। অপরাধীদের চূড়ান্ত শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত সব পক্ষকেই থাকতে হবে সোচ্চার। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধর্ষকরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী হয়ে থাকে। সুবর্ণচরের সর্বশেষ অঘটনের ধর্ষকরাও স্পষ্টতই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবে আইনগত প্রক্রিয়ায় গিয়ে ওই গৃহবধূ ও তার পরিবার যাতে অসহায়বোধ না করেন, তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পাশাপাশি সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে। দলমত নির্বিশেষে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। একই উপজেলায় কেনো একই অপরাধের এতোদ্রুত পুনরাবৃত্তি ঘটছে- এ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে চিন্তা ও তৎপরতাও আমরা দেখতে চাই প্রশাসনে, সরকারে, রাজনৈতিক দলে ও সমাজে। বস্তুত এর মধ্য দিয়ে আরো একবার প্রমাণ হলো যে, ধর্ষকদের কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক রঙ নেই। আমরা মনে করি, সুর্বণচরে ধর্ষণের সঙ্গে জড়িতরা মানবতার কলঙ্ক। তারা যে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত, তার শীর্ষ পর্যায়কেও ভাবতে হবে একই এলাকায় তাদের নেতাকর্মীরা কেনো ধর্ষণকেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ারে পরিণত করছে। রাজনৈতিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ তো বটেই, সেখানকার নেতৃত্বেও কি গলদ রয়েছে? কারা প্রতিনিধিত্ব করছেন সেখানে? এও মনে রাখতে হবে, আইন- শৃঙ্খলার সার্বিক অবনতিও এ ধরনের অপরাধের জন্ম দিতে থাকে। নোয়াখালীর সুবর্ণচরে একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা সেখানকার সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে।

Share