ধর্মীয় শিক্ষালয়েও এই বর্বরতা!

ধর্মীয় শিক্ষালয়েও এই বর্বরতা!

  • কোটি মানুষকে কাঁদিয়ে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতের বিদায়

  • দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিতে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশ

  • নরপিশাচদের রক্ষায় একটি অপশক্তি এখনও তৎপর

অরুন দাস
এমপিওভুক্ত (মান্থলি পে অর্ডার) মাদ্রাসাগুলোতে বাংলা, ইংরেজি ও অংকের মতো সাধারণ শিক্ষা বাধ্যতামূলক হলেও মূলত এসব প্রতিষ্ঠানে ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষার ওপরই বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে।

ইসলাম মানে শান্তির ধর্ম; সেখানে সহিংসতা কিংবা যৌন নিপীড়নের মতো আইন ও সমাজনিষিদ্ধ কোনো কর্মকান্ডের সুযোগ নেই।

অথচ ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় ঘটে গেলো স্বাধীন বাংলাদেশের সমকালীন ইতিহাসের জঘন্যতম ঘটনা। সেখানকার কোমলমতি এক ছাত্রীর ওপর যৌন নিপীড়ন চালিয়েই খান্ত হননি মাদ্রাসাঅধ্যক্ষ এস এম সিরাজ-উদ-দৌলা; যৌন নিপীড়নের প্রতিকার চেয়ে তার বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নেওয়ার অপরাধে (!) নিষ্পাপ মেয়েটিকে নির্মমভাবে পুড়িলে মেরেছে কুলাঙ্গার অধ্যক্ষের অনুসারী একদল নিরপিশাচ।

সরকার-স্বীকৃত একটি ধর্মীয় শিক্ষালয়ে ঘটে যাওয়া বর্বরোচিত এ ঘটনায় স্তম্ভিত গোট দেশ, ফুঁসে উঠেছে দেশবাসী, বিশ্ব গণমাধ্যমেও ঠাঁই পেয়েছে কলঙ্কজনক এ খবর। প্রবাসী বাংলাদেশীরাও হয়েছেন হতভম্ব, শোকাহত।

অপরাধীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই একাধিকবার নির্দেশ দিয়েছেন। পুরো বিষয়টির ওপর কঠোর নজরদারি রাখছেন তিনি।

উচ্চ আদালতও বলেছেন, পৈশাচিক এ ঘটনার তদন্ত ও অপরাধীদের শাস্তির ব্যাপারে চলমান তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার ওপর তাঁরাও নজরদারি করছেন। সংশ্লিষ্টরা কোনো গাফিলতি করলে হাইকোর্ট হস্তক্ষেপ করবে বলেও হুশিয়ারি দিয়েছেন উচ্চ আদালতের একটি দ্বৈত বেঞ্চের বিচারপতিরা।

তা সত্ত্বেও একটি কুচক্রী মহল কুলাঙ্গার অধ্যক্ষ নরপিশাচ সিরাজ-উদ-দৌলা ও তার সহযোগীদের রক্ষার জন্য জোর তৎপরতা চালাচ্ছে।

নজিরবিহীন নির্মমতার শিকার মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির (১৮) মূল ঘাতক, পুলিশ হেফাজতে থাকা অধ্যক্ষকে মুক্ত করতে মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করছে। অথচ পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নিচ্ছে না।

এ নিয়ে বিভিন্ন মহলসহ সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে বইছে সমালোচনার ঝড়।

নরপিশাচ সিরাজ-উদ-দৌলার শাস্তি নিশ্চিত করতে শেষপর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য দৃঢ় অঙ্গীকার করেছিলেন ফেনীর সোনাগাজীতে অগ্নিদগ্ধ মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি। শুরু থেকেই শঙ্কা ছিলো, তবু নিবু নিবু জীবনপ্রদীপ ঘিরে ছিলো অসংখ্য প্রার্থনার হাত।

তাঁকে বাঁচাতে ছিলো চিকিৎসকদের অক্লান্ত প্রচেষ্টা, তৎপর ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। ছিলো সর্বস্তরের মানুষের ভালোবাসা আর দোয়া। তবে সব চেষ্টা- প্রার্থনা নিষ্ফল করে সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন নুসরাত। টানা পাঁচ দিন প্রায় ১০৮ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে হার মানলেন অসমসাহসী ও প্রতিবাদী এই তরুণী।

গত ১০ এপিল দিবাগত রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। এর আগে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। আগের দিন ৯ এপ্রিল তার ফুসফুস সক্রিয় করতে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায়ই অস্ত্রোপচার করা হয়।

মৃত্যুর কাছে পরাজিত হলেও নিপীড়ক মাদ্রাসাঅধ্যক্ষ ও তার দোসরদের কাছে এতোটুকু মাথা নোয়াননি নুসরাত। বরং অন্যায়ের প্রতিবাদ করে মৃত্যুকেই আলিঙ্গন করেছেন। রাফির এই দ্রোহ, অকুতোভয় প্রাণ বেঁচে থাকলো লাখো হৃদয়ে। রাফির মৃত্যুতে লজ্জার সাগরে ডুবলো জাতি। অকালমৃত্যু হলো একটি স্বপ্নের। শিক্ষায়তনও যে একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর কারণ হতে পারে, তা যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে গেলেন তিনি।

প্রিয় নুসরাতের মৃত্যুসংবাদে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার স্বজনরা। হাসপাতালে কাঁদতে- কাঁদতেই জ্ঞান হারান রাফির দুই ভাই, মা ও বাবা। এ সময় বার্ন ইউনিটে উপস্থিত সবার চোখই ছিলো অশ্রুভেজা। পুরো হাসপাতালেই নেমে এসেছিলো শোকের ছায়া।

ফেনীর সোনাগাজীতে রাফির বাড়িতেও ছিলো কান্না আর আহাজারি। রাতেই আইন- শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ওই এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করেন।

গত ১১ এপ্রিল সকালে ময়নাতদন্ত শেষে রাফির মরদেহ ঢামেক মর্গ থেকে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর তা নিয়ে যাওয়া হয় সোনাগাজীতে। সেখানে দাদির কবরের পাশে তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

নুসরাতের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে শোক জানিয়েছেন। জড়িতদের বিচার দাবি করেছেন তারা।

সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার এ ছাত্রী একই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ সিরাজের হাতে শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছে অভিযোগ করে তার মা গত ২৭ মার্চ থানায় মামলা করছিলেন। এরপর পুলিশ সিরাজকে গ্রেপ্তার করে। এরপর তার পক্ষে- বিপক্ষে বিক্ষোভ হয়েছে। অধ্যক্ষের সহযোগীরা মামলা তুলে নিতে নুসরাতের পরিবারকে হুমকিও দিয়ে আসছিলো।

গত ৬ এপ্রিল মাদরাসায় আলিম পরীক্ষার আরবি বিষয়ে পরীক্ষা দিতে যান নুসরাত। পরীক্ষা শুরুর আগে হল থেকে তাঁকে কৌশলে ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে বোরকা, নেকাব ও হাতমোজা পরা চারজন অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেয়। তিনি রাজি না হওয়ায় কেরোসিন জাতীয় দাহ্য পদার্থ ঢেলে তার শরীরে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায় ওই চারজন।

মারাত্মক দগ্ধ অবস্থায় তাকে প্রথমে সোনাগাজী হাসপাতাল, পরে ফেনী সদর হাসপাতাল ও সর্বশেষ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি আনা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় তাকে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে পাঠানোর কথা ছিলো। কিন্তু তার শারীরিক অবস্থার কারণে সিঙ্গাপুরের জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকদের পরামর্শে সেখানে নেওয়া সম্ভব হয়নি।

জানা গেছে, বর্বরোচিত এ ঘটনার আগের রাতে মাদ্রাসার ‘অবৈধ ছাত্রাবাসে’ গোপন বৈঠক করেছিলো অভিযুক্ত অধ্যক্ষ সিরাজের সহযোগীরা। মামলার আসামিসহ সন্দেহভাজন কয়েকজনকে ওই রাতে ছাত্রাবাস থেকে বের হতে দেখেছে স্থানীয় লোকজন।

স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদ
আদরের মেয়ের মৃত্যু সংবাদ শোনার পরপরই গত ১০ এপ্রিল বার্ন ইউনিটের সামনে বৃদ্ধ বাবা কাউসার মোহাম্মদ মুসা বুকফাটা আর্তনাদ করতে থাকেন, ‘আমার মা কই গেলো রে, মা তুই যান না, ফিরে আয়।’ মা শিরিনা আক্তার বুক চাপড়ে আর্তনাদ করছিলেন। জ্ঞান হারান ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান।

তাঁদের পাশেই দাঁড়ানো ছিলেন নুসরাতের মামা সৈয়দ সেলিম। ভাগ্নের কাঁধে সান্ত¡নার হাত রেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। মামা সৈয়দ সেলিম বলেন, নুসরাত আমার বড় আদরের ভাগ্নি ছিলো। এমন একটি মেয়েকেও যৌন হয়রানি করলো অধ্যক্ষ। তারপর আগুনে পুড়িয়ে হত্যা, আমরা কোনোভাবেই মানতে পারছি না। নুসরাত বড় হয়ে বাবার মতো শিক্ষক হতে চেয়েছিলো। তার এই স্বপ্নকে যারা জ্বালিয়ে দিয়েছে, তারা ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য না।

এ সময় বার্ন ইউনিটের সমন্বয়ক সামন্ত লাল সেনসহ অন্য চিকিৎসকরা তাঁদের সান্ত¡না দেয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলেন। তাঁদের কান্নায় হাসপাতালের পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে।

আশপাশের অন্যান্য রোগীর স্বজন, আনসার সদস্য, নার্স, গণমাধ্যমকর্মীরাও এ সময় চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। টানা ছয় দিন ধরে পরিবারের সঙ্গে তাঁরাও মেয়েটির সুস্থতা কামনা করে অপেক্ষায় ছিলেন।

নুসরাতের মৃত্যুর খবর শুনে গত ১০ এপ্রিল রাতে সোনাগাজী পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডে উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের বাড়িতে স্বজনদের মধ্যেও কান্নার রোল পড়ে যায়। তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে তার বৃদ্ধ দাদা মোশারফ হোসেন নাতিনের জন্য কেঁদে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। বিলাপ করছেন রাফির ছোট ফুফু রহিমা খাতুন। পাশে রাফির চাচাদের ঘরেও চলছে কান্নার রোল। বাড়িতে গত ১০ এপ্রিল রাতেও পুলিশ মোতায়েন ছিলো।

লড়াইয়ের লিখিত অঙ্গীকার
গত ১০ এপ্রিল মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে স্থানান্তরের আগ পর্যন্ত রাফিকে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন সোনাগাজী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কামাল হোসেন। তিনি বলেন, রাফির বাসায় ৯ এপ্রিল তল্লাশি চালিয়ে তার পড়ার টেবিলের একটি খাতার দুই পাতায় সিরাজের অপকর্ম নিয়ে লেখা পান। তিনি সেগুলো মামলার আলামত হিসেবে জব্দ করেন।

নুসরাতের চাচাতো ভাই মো. ফয়েজ বলেন, চিঠিটি নুসরাতের নিজের হাতেই লেখা। আমাদের সামনে পুলিশ অন্য খাতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখে খাতাগুলোও নিয়ে গেছে।
একটি পাতায় লেখা আছে, ‘আমি লড়বো শেষনিঃশ্বাস পর্যন্ত। আমি প্রথমে যে ভুলটা করেছি আত্মহত্যা করতে গিয়ে, সেই ভুলটা দ্বিতীয়বার করবো না। মরে যাওয়া মানেই তো হেরে যাওয়া। আমি মরবো না, আমি বাঁচবো। আমি তাকে শাস্তি দেবো যে আমায় কষ্ট দিয়েছে। আমি তাকে এমন শাস্তি দেবো যে তাকে দেখে অন্যরা শিক্ষা নিবে। আমি তাকে কঠিন থেকে কঠিনতম শাস্তি দেবো ‘ইনশাআল্লাহ’।

আরেকটি পাতায় রাফি লিখেছেন, ‘তামান্না, সাথী। তোরা আমার বোনের মতো এবং বোনই। ওই দিন তামান্না আমায় বলেছিলো, আমি নাকি নাটক করতেছি। তোর সামনেই বললো। আরো কি কি বললো, আর তুই নাকি নিশাতকে বলেছিলে, আমরা খারাপ মেয়ে। বোন, প্রেম করলে কি সে খারাপ?

তোরা সিরাজ উদ দৌলা সম্পর্কে সব জানার পরও কিভাবে তার মুক্তি চাইতেছিস। তোরা জানিস না, ওই দিন রুমে কি হইছে? ওনি আমার কোন জায়গায় হাত দিয়েছে এবং আরো কোন জায়গায় হাত দেয়ার চেষ্টা করেছে, উনি আমায় বলতেছে নুসরাত ডং করিস না। তুই প্রেম করিস না। ছেলেদের সঙ্গে প্রেম করতে ভালো লাগে। ওরা তোরে কি দিতে পারবে? আমি তোরে পরীক্ষার সময় প্রশ্ন দেবো। আমি শুধু আমার শরীর দিতাম ওরে। বোন, এ জবাবে উত্তর দিলাম। আমি একটা ছেলে না হাজারটা ছেলের…’

আগের রাতে গোপন বৈঠক
মাদ্রাসার পুরনো ভবনের তৃতীয় তলায় হেফজখানার পাশে দুইটি কক্ষে কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই অবৈধভাবে ছাত্রাবাস গড়ে তুলেছিলেন অধ্যক্ষ সিরাজ। সেখানে পরীক্ষার্থীদের নাম করে তাঁর ক্যাডার বাহিনীর সদস্যরা থাকতো।
সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, মাদ্রাসা কমপ্লেক্সের মধ্যে ছাত্রীদের জন্য টয়লেট আছে সাইক্লোন শেল্টার ভবনের চার তলার ছাদে। নুসরাত ওই ছাদে যাওয়ার পর তার শরীরে আগুন দেয়া হয়। তাকে গোপনে কেউ বান্ধবী নিশাতের ‘বিপদের’ তথ্য দেয়। এতে সন্দেহ করা হচ্ছে, ছাদে বোরকা পরা আক্রমণকারীদের মধ্যে কথিত শম্পাসহ (যে নাম নুসরাত শুনেছে) এক বা একাধিক নারী ছিলো। তবে গত ১০ এপ্রিল পর্যন্ত আক্রমণকারীদের চিহ্নিত করতে পারেনি তদন্তকারীরা। সংশ্লিষ্ট কেউ এ ব্যাপারে এখনো কোনো সূত্র খুঁজে পায়নি।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে মাদ্রাসার এক শিক্ষক বলেন, গত ৬ এপ্রিল সকালে নুসরাতের শরীরে আগুন দেয়ার আগে গত ৫ এপ্রিল রাত সাড়ে ১০টার দিকে অধ্যক্ষের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ফাজিলের ছাত্র নূর উদ্দিন এবং আলিম পরীক্ষার্থী নাসির উদ্দিনকে মাদ্রাসার ছাত্রাবাস থেকে বের হতে দেখেন। সেখানে মামলার আরেক গ্রেপ্তারকৃত আসামি আরিফুর রহমান অবস্থান করছিলো বলে জানা যায়। পরীক্ষার আগে এতোরাতে জ্যেষ্ঠ একজনের সঙ্গে নাসিরকে দেখে তাঁর সন্দেহ হয়। মামলা দায়েরের পর সিরাজের পক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচিতে সামনের সারিতে ছিলো নূর উদ্দিন ।

মাদরাসার কাছের এক দোকানি বলেন, নুসরাত অগ্নিদগ্ধ হওয়ার সময়ই তিনি নূর উদ্দিনকে দ্রুত চলে যেতে দেখেন। তখন তিনি ডাকলেও নূর দাঁড়ানো যাবে না বলে জানায়।

গত ১০ এপ্রিল সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, গত ৭ এপ্রিল থেকে মাদ্রাসার পুরনো ভবনের তৃতীয় তলায় হেফজখানা ও ছাত্রাবাস বন্ধ আছে।

মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, এখানে একটি হেফজখানা আছে। তবে হোস্টেল কিভাবে চলে তা এখনো আমি জানি না।

মাদ্রাসার অফিস সহকারী (যিনি সব হিসাবের কাজ করেন) সিরাজুল হক বলেন, এখানে অফিশিয়ালি কোনো ছাত্রাবাস নেই। অধ্যক্ষ দুটি রুমে ছাত্রদের থাকার ব্যবস্থা করে দেন। এ ব্যাপারে আমি জানি না। তবে হেফজখানায় ১২ ছাত্র এবং একজন শিক্ষক আছেন। তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়।

মাদ্রাসার একাধিক সূত্র জানায়, দুটি কক্ষে প্রতি বছরই নেতা শ্রেণির কিছু ছাত্রকে বিনা খরচে থাকার ব্যবস্থা করে দেন সিরাজ। এ ফলে তারা অনুগত হয়। এরা বিভিন্ন সময় তাঁর পক্ষ নিয়ে বিবাদে জড়ায়। শিবির ক্যাডার নূর উদ্দিন, স্বঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা শাহাদাত হোসেন শামীমসহ কয়েকজন এই সুবিধা পেয়েছে। সর্বশেষ আরিফুরসহ কয়েকজন ওই কক্ষে থাকছিলো। হেফজখানার শিক্ষক আব্দুল কাদের সিরাজের তথ্যদাতা ও ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তিনি দরিদ্র শিক্ষার্থীদের খাবার কমিয়ে দিয়ে সিরাজের ক্যাডারদের ফাও খাবার দিতেন এবং অবৈধভাবে থাকার ব্যবস্থা করতেন। হাফেজ আব্দুল কাদের নুসরাত হত্যা মামলার পলাতক আসামি।

জানা গেছে, মাদরাসার নিরাপত্তাকর্মী মোস্তফা রাতে নৈশপ্রহরীর কাজ করেন। জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, গত ৫ এপ্রিল তিনি ১০টার দিকে গেটে তালা লাগিয়ে চলে যান। আরিফের (গ্রেপ্তারকৃত আসামি) কাছে গেটের চাবি আছে। নূর উদ্দিন, শামীমসহ কয়েকজন ছাত্রাবাসে নিয়মিত আসত বলেও জানান তিনি।

ছাত্রীদের টয়লেট শুধু ছাদেই
সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসা পরীক্ষা কেন্দ্রের সচিব নূরুল আফছার ফারুকী ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নূরুল আমিন জানান, কেন্দ্রে ছয়টি প্রতিষ্ঠানের ৩৮৩ জন শিক্ষার্থী এবার আলিম পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।

কমপ্লেক্সের ভেতরে মোট পাঁচটি টয়লেট আছে। এর মধ্যে ছেলেদের টয়লেট তিনটি নিচে এবং মেয়েদের দুটি টয়লেট তিন তলার ছাদে (যার সামনে রাফির শরীরে আগুন দেয়া হয়)।

তাঁরা জানান, ৬ এপ্রিল সকালে কেন্দ্রে যে পুলিশ সদস্যরা ছিলেন রাফি দগ্ধ হওয়ার কিছু সময় আগে তাঁরা দায়িত্বে যোগ দেন। কারণ তাঁরাই পাহারা দিয়ে প্রশ্নপত্র নিয়ে আসেন। মাদ্রাসায় সকাল সাড়ে ৭টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ক্লাস চলছিলো।

একটি সূত্র জানায়, নুসরাতের বক্তব্য অনুযায়ী কেউ তাকে বান্ধবী নিশাতের বিপদের কথা বলেছিলো। ফলে তিনি বান্ধবীকে খুঁজতে টয়লেট যেখানে সেখানে গিয়ে থাকতে পারেন। ওই ভবনে হামলাকারীদের লুকিয়ে থেকে সটকে পড়ার যথেষ্ট সুযোগ ছিলো।

পুলিশ হেফাজত থেকে ছাড়া পাওয়ার পর গত ১০ এপ্রিল মাদ্রাসায় দায়িত্ব পালন করছিলেন অফিস সহায়ক নূরুল আমিন ও নিরাপত্তাকর্মী মোহাম্মদ মোস্তফা। ঘটনার পর পুলিশ তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছিলো। তাঁরা বলেন, সাইক্লোন শেল্টার ভবনের তিন তলাটি ঘটনার সময় খোলা ছিলো। ভবন থেকে পালিয়ে যাওয়ার তিনটি পথ আছে জানানোর পাশাপাশি দেখিয়েও দেন তাঁরা।

প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশ
নুসরাতের হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম বলেন, ‘নুসরাতের মর্মান্তিক মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। শেখ হাসিনা নুসরাতের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নুসরাতের হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় আনতে এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন।

অধ্যক্ষসহ কয়েকজন রিমান্ডে
২৭ মার্চ ওই ছাত্রীকে নিজ কক্ষে নিয়ে শ্লীলতাহানি করেন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা। এ ঘটনায় ছাত্রীর মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন। ওইদিনই অধ্যক্ষ সিরাজকে আটক করে পুলিশ। এরপর আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

এদিকে নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা মামলার প্রধান আসামি সিরাজ উদদৌলাসহ তিনজনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। ১০ এপ্রিল দুপুরে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক সরাফ উদ্দিন আহম্মেদ এ আদেশ দেন।

কোর্ট ইন্সপেক্টর গোলাম জিলানী জানান, সিরাজকে সাত দিন, একই মাদ্রাসার ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক আবছার উদ্দিন ও সহপাঠী আরিফুল ইসলামকে পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। এর আগে ৯ এপ্রিল একই আদালত আসামি নুর হোসেন, কেফায়াত উল্লাহ, মোহাম্মদ আলা উদ্দিন ও শাহিদুল ইসলামকে পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

ওসি প্রত্যাহার, মামলা পিবিআইয়ে
মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সোনাগাজী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেনকে প্রত্যাহার করে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নে (এপিবিএন) সংযুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে মামলার তদন্তভার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) দেয়া হয়েছে। গত ১০ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তরের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা এ কে এম কামরুল আহছান এ তথ্য জানিয়েছেন।

পিবিআই দায়িত্ব নেওয়ার পর এ মামলার গুরুত্বপূর্ণ দুই আসামি আটক হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে। এদের একজনকে ঢাকার ফকিরাপুলের একটি হোটেল থেকে আটক করা হয়। তিনি একটি রাজনৈতিক দলের থানা পর্যায়ের নেতা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি।

অপরজনকে আটক করা হয়েছে ফেনী থেকে। তিনিও একটি ছাত্র সংগঠনের কর্মী। তবে পিবিআই সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়টি স্বীকার করেননি। পিবিআইর ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, মামলার তদন্ত কাজ চলছে। আমরা আগাচ্ছি, শিগগিরই ভালো খবর দিতে পারবো।

Share