পুরান ঢাকার ৩০ লাখ মানুষ জমি হারানোর আতঙ্কে

পুরান ঢাকার ৩০ লাখ মানুষ জমি হারানোর আতঙ্কে

  • সুত্রাপুর, কোতয়ালী, ওয়ারী, গেন্ডারিয়া, লালবাগ ও শ্যামপুর থানা

  • ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ৭ বছর তাদের খাজনা নেওয়া হচ্ছে না

  • লিজ নবায়ন না করায় খাসজমি ঘোষণা করা হয়েছে: ভূমি অফিস

রফিকুল ইসলাম সবুজ
রাজধানীর পুরান ঢাকার কোতোয়ালি ও সূত্রাপুর মৌজার আওতাধীন ছয়টি থানার তহসিল (ভূমি) অফিসগুলো সেখানকার প্রায় ২০০ একর জমির খাজনা নেওয়া সাত বছর যাবত বন্ধ করে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

এতে বিপাকে পড়েছে ওইসব জমির ওপরে গড়ে ওঠা পাঁচ হাজারেরও বেশি বাড়িঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা। সব মিলিয়ে তাদের সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ বলে জানা গেছে; যারা এখন জমির মালিকানা হারানোর আতঙ্কে ভুগছেন।

তবে ভূমি অফিস বলছে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এসব সম্পত্তির লিজ গ্রহিতারা মেয়াদ শেষে লিজ নবায়ন করেননি। ফলে এখন এ সম্পত্তি খাস খতিয়ানভুক্ত হয়েছে। তাই তাদের কাছ থেকে খাজনা নেওয়ার সুযোগ নেই।

ভুক্তভোগীদের দাবি, পূর্বসুরীদের কাছ থেকে পাওয়া ওইসব জমি তারা বংশপরম্পরায় ভোগ- দখল করে আসছেন। কিন্তু তাদেরকে কোনো নোটিশ না দিয়েই ওইসব সম্পত্তি খাস খতিয়ানভুক্ত করেছে সরকার। এর ফলে সাত বছর ধরে তারা খাজনা দিতে পারছেন না। এ কারণে ওইসব জমিতে ভবন কিংবা অন্য কোনো স্থাপনা নির্মাণে রাজউকের নকশা অনুমোদন, জমি বেচাকেনা, নামজারি, হেবা রেজিস্ট্রি বা ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টননামা দলিল রেজিস্ট্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।

এ বিষয়ে ঢাকার কোতয়ালী থানার সহকারি কমিশনার (ভূমি) অফিসের দাবি, ১৯৪৫ সালে ওইসব আবাসিক জমি ৩০ বছরের জন্য লিজ দেয়া হয়েছিল। শর্ত ছিল ৩০ বছর পরপর তিনবার লিজ নবায়ন করতে হবে। অর্থাৎ ৯০ বছর পর আর নবায়নের প্রয়োজন হবে না।

কিন্তু লিজ নেওয়ার ৩০ বছর পর বাড়ির মালিকদের বেশির ভাগই লিজ নবায়ন করেননি। এ কারণে যারা শুধুমাত্র তাদের জমিই খাস খতিয়ানভুক্ত করা হয়েছে এবং তাদের খাজনা নেওয়া হচ্ছে না।

ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারিরা জানান, ২০১১ সালে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক পরিপত্রের পরিপ্রেক্ষিতে ওই দুই মৌজার আবাসিক জমির খাজনা নেওয়া বন্ধ করে দেয় সূত্রাপুর ও কোতোয়ালি ভূমি অফিস।

এদিকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া পিতৃপুরুষের জমি খাস খতিয়ানভুক্ত হওয়ার খবর শুনে অনেকে হতভম্ব হয়ে পড়েন। এই সংকট নিরসনে পুরান ঢাকার সচেতন নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রধানমন্ত্রী, ভূমিমন্ত্রী ও ভূমি সচিবের কাছে লিখিত দাবি জানানো হলেও সাত বছরের মধ্যে সমস্যার সমাধান মেলেনি বলে দাবি করেছেন সংগঠনের আহবায়ক ও ফরিদাবাদের হরিচরণ রায় রোডের বাসিন্দা মাহবুব উদ্দিন চৌধুরী।

তিনি জানান, সর্বশেষ গত ১৫ মার্চ ভূমিমন্ত্রী ববারর আবেদন করা হয়। আবেদনে বলা হয়, সুত্রাপুর ভুমি অফিস খাঁজনা না নেওয়ার কারণে বাড়ি ও জমির মালিকরা নানা ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তাই দ্রুত সংকট নিরসনের দাবি জানানো হয় ওই আবেদনে।

পুরান ঢাকার সচেতন নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক মাহবুব উদ্দিন চৌধুরী জানান, জমির খাজনা দেয়ার জন্য তারা প্রতিনিয়ত ভূমি অফিসে গিয়ে ব্যর্থ হচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘বংশপরম্পরায় দাদার জমি বাবা পেয়েছেন। বাবার জমি আমরা পেয়েছি। জমির স্বচ্ছ দলিলও রয়েছে। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমি হঠাৎ করেই সরকার খাসমহালভুক্ত করেছে। এর পেছনে কী যুক্তি বা আইনি ভিত্তি রয়েছে, তা আমাদের বোধগম্য নয়।’

হঠাৎ করে খাজনা নেওয়া বন্ধ করায় স্থানীয় জমির মালিকদের মধ্যে উদ্বেগ- উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভুক্তভোগীদের মধ্যে কেউ কেউ প্রথম থেকেই উত্তরাধিকার সূত্রে জমির মালিক, কেউ কেউ আবার ক্রয়সূত্রেও মালিক হয়েছেন।

তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সময়ে তদবির করে বা দালালের মাধ্যমে ঘুষের বিনিময়ে খাজনা দেয়ার অনুমতি মিলেছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে গত কয়েক বছর ধরে পুরোপুরি খাজনা নেওয়া বন্ধ করে দেয়া হয়। যুগযুগ ধরে এই এলাকার মানুষ জমির মালিকানা, দালিলিক নথিপত্র নিয়ে বসবাস করে আসছেন। আজ তাদেরকেই শুনতে হচ্ছে, এই জমির মালিক তারা নন। এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কিছুই হতে পারে না।

শর্ত অনুযায়ী ৩০ বছর পর লিজ নবায়ন না করার কারণে এসব জমি খাস খতিয়ানভুক্ত করা হয়েছে বলে ভুমি অফিস দাবি করছে- এর জবাবে ভুক্তভোগী মাহবুব উদ্দিন চৌধুরীর পাল্টা প্রশ্ন, তাহলে এতোবছর ধরে কিভাবে খাজনা নেওয়া হলো? আর তাদেরকে কোনো নোটিশ ছাড়াই কেনো এসব সম্পত্তি ‘খাসজমি’ হিসেবে ঘোষণা করা হলো?

তিনি বলেন, খাসমহালের নামে খাজনা না নেওয়ার কারণে সুত্রাপুর, কোতয়ালী মৌজার অন্তর্ভুক্ত সুত্রাপুর, কোতয়ালী, ওয়ারী, গেন্ডারিয়া, লালবাগ ও শ্যামপুর থানার প্রায় পাঁচ শ’ খতিয়ানের পাঁচ হাজারেরও বেশি ঘরবাড়ির ৩০ লাখের বেশি মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তারা কেউই ব্যবসাবাণিজ্য প্রসারের জন্য ব্যাংকঋণ নিতে পারছেন না। অথচ খাসমহালের নামে ভুমি অফিসগুলো ইতিপূর্বে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

ভুক্তভোগীরা জানান, সূত্রাপুর থানার ফরিদাবাদ, গেন্ডারিয়া, মিল ব্যারাক, পোস্তগোলা, আইজি গেট, ধূপখোলা, কাঠেরপুল, ওয়ারী ও শ্যামপুর এলাকার বিভিন্ন গলির জমির খাজনা নেওয়া হচ্ছে না। এছাড়া শাঁখারীনগর লেন, ঢালকা নগর লেন, আলমগঞ্জ লেন, কালীচরণ সাহা রোড, সতীশ সরকার রোড, অক্ষয় দাশ লেন, দীননাথ সেন রোড, ডিস্টিলারি রোড, বাহাদুরপুর লেন, ফরিদাবাদ লেন, নবীন চন্দ্র গোস্বামী রোড, লালমোহন পোদ্দার লেন, করিমউল্লাহ বাগ, হরিচরণ রায় রোড, কেবি রোড, এস কে দাশ রোড, সাবেক ফরাশগঞ্জ লেন, নামাপাড়া, ঋষিকেশ দাশ রোড এবং আরএম দাশ রোডের জমির খাজনা নেওয়া হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২০১১ সালের মে মাসে ভূমি মন্ত্রণালয়ের খাস জমি-১ শাখা থেকে সুত্রাপুর ও কোতয়ালী মৌজার ওইসব জমিকে ‘খাসজমি’ ষোষণা করে পরিপত্র জারি করা হয়েছিল। ওই সময় পরিপত্রটি ঢাকার কোতোয়ালি সার্কেলের সহকারি কমিশনারের (ভূমি) কাছে পৌঁছার পর সেটি পাঠানো হয় সূত্রাপুর ও কোতোয়ালি ভূমি অফিসে। এরপর থেকে ওই দুই এলাকার এক হাজারের বেশি বাসিন্দার কাছ থেকে খাজনা আদায় বন্ধ রাখা হয়েছে।

কোতয়ালী ভূমি অফিসের ভূমি সহকারি কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ১৯৪৫ সালে ওইসব আবাসিক জমি ৩০ বছরের জন্য লিজ দেয়া হয়েছিল। শর্ত ছিল ৩০ বছর পরপর তিনবার নবায়ন করতে হবে। এভাবে তিন দফায় লিজের মেয়াদ ৯০ বছর পূর্ণ হলে ওই ব্যক্তির আর লিজ নবায়নের প্রয়োজন হতো না।

কিন্তু যারা নবায়ন করেননি শুধুমাত্র তাদের জমিই সরকার খাস ঘোষণা করেছে। এ কারণে তাদের কাছ থেকে খাজনা নেওয়া হচ্ছে না। তবে তারা যদি সরকারের নিয়ম মেনে শর্ত পূরণ করে লিজ নবায়ন করেন তাহলে তাদের খাজনা নেওয়া হবে।

জানতে চাইলে কোতয়ালী রাজস্ব সার্কেলের সহকারি কমিশনার (ভূমি) মাহমুদা আক্তারও একই কথা বলেন। তিনি জানান, শর্ত অনুযায়ী লিজ নবায়ণ না করার কারণে সরকার এসব সম্পতি খাস ঘোষণা করেছে। তবে যখন এটা করা হয়েছিল তখন তিনি দায়িত্বে ছিলেন না।

তবে জেলা প্রশাসক এইসব জমির বাজারমূল্যের ৩০ শতাংশ ফি নির্ধারণ করে নবায়নের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ে পত্র দিলে এখনো লিজ নবায়নের সুযোগ রয়েছে বলে কোতয়ালী ও সুত্রাপুর ভূমি অফিসের সংস্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব (খাস জমি- ১) মো. মনিরুজ্জামান জানান, লিজগ্রহিতারা শর্ত অনুযায়ী লিজ নবায়ন না করার কারণে তা বাতিল করে তাদের ভোগদখলীয় জমি খাস খতিয়ানভুক্ত করে পরিপত্র জারি করা হয়েছিল। এটা নিয়ম মেনেই করা হয়েছে। তাই অনিয়মের যে অভিযোগ ভুক্তভোগীরা করছেন তা সঠিক নয়।

এ বিষয়ে ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী বলেন, সুত্রাপুর ও কোতয়ালী ভুমি অফিস খাজনা না নেওয়ায় হয়রানির শিকার সেখানকার বাড়ি ও জমির মালিকদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে করা আবেদনের বিষয়ে তাঁর কিছু জানা নেই। তবে বিষয়টি তিনি খতিয়ে দেখবেন। তবে সেখানে কেউ যাতে অন্যায়ভাবে হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেবেন বলে মন্ত্রী জানান।

Share