ফুটবলে অনন্য উচ্চতায় মিরোনা

ফুটবলে অনন্য উচ্চতায় মিরোনা

বর্তমান বিশ্বে নারীরা পুরুষদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছেন। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। বাংলাদেশের নারীরা এখন কোথায় নেই? পুরুষদের সঙ্গে সমানতালে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন তারা। অফিস, আদালত আর দোকানপাট থেকে শুরু করে সেনাবহিনী, নৌ বাহিনী, বিমান বাহিনী, পুলিশ, বাণিজ্যিক উড়োজাহাজের ককপিটে- নারীরা এখন এগিয়ে চলার সাহসী প্রতীক। একেকজন সাহসী নারীর গল্প এখন আরেক নারীর এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা। তেমনই একজন নারী মিরোনা মিরু। খেলার মাঠে তিনি এক ইতিহাস। পুরুষ ফুটবল দলে দেশের প্রথম নারী কোচ। তার সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন সফিকুল হাসান সোহেল

মিরোনার বাড়ী বাগেরহাট জেলায়। পড়তেন সদর উপজেলার রহিমাবাদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন ইভেন্টে অংশ নিয়ে সবার নজর কেড়েছিলেন মিরোনা। দেখতে ছোটখাটো। উচ্চতা ৪ ফুট ৮ ইঞ্চি। অনেকের চোখে পিচ্চি। কিন্তু মাঠে মিরোনা অপ্রতিরোধ্য। বিদ্যালয়ের বারান্দা থেকে মাঠ এবং এখন জাতীয় পর্যায়ে একজন সফল নারী। এতোকম উচ্চতার জন্য তাকে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়েছে। তবে মনের জোর আর কঠোর পরিশ্রমে আজ তার অবস্থান অনেক ওপরে।

মিরোনা জানান, অনেকেই প্রথম দেখায় আমার যোগ্যতা সম্পর্কে জানতেই চাইতেন না। আমাকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে নিতেন তারা। উচ্চতার কারণে আমার বদলে অন্য কাউকে বেছে নিতেন কোচ। যোগ্যতা প্রমাণের জন্য আমাকে তাই একটু বেশিই পরিশ্রম করতে হয়েছে।

মিরোনার বাবা শেখ আবদুল গনি ব্যবসায়ী, মা রমিসা বেগম গৃহিণী। এই দম্পতির তিন ছেলে, তিন মেয়ের মধ্যে তৃতীয় মিরোনা। ছোটবেলা থেকেই খেলা- পাগল। বললেন, ছোটবেলায় ছেলেদের সঙ্গেই সারাক্ষণ খেলতাম। খেলতাম ভাইদের সঙ্গেও। আমরা সবাই পিঠাপিঠি ভাই- বোন। খেলায় আমিই এগিয়ে থাকতাম।

তখন তিনি রহিমাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। সেবার ১০০ মিটার দৌড় প্রতিযোগিতায় সেরা হয়েছিলেন মিরোনা। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়কার ঘটনা। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ১০০ মিটার, ২০০ মিটার দৌড় এবং লংজাম্প তিনটি ইভেন্টেই অংশ নিয়ে তিনটিতেই প্রথম হয়েছিলেন। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় আন্ত:স্কুল ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় থানা, জেলা ও বিভাগ সেরা হয়ে জাতীয় পর্যায়ে খেলার সুযোগ পেলেন। সেবার ২০০ মিটার দৌড়ে দ্বিতীয় পুরস্কার ওঠে মিরোনার হাতে।

এই প্রতিযোগিতার আগে বাগেরহাট সদর স্টেডিয়ামে অনুশীলন করেছেন বেশ কিছুদিন। তার বাবা খুশি হয়ে তখন সাইকেলও কিনে দিয়েছিলেন। বললেন, আন্ত :স্কুলে ভালো করার পর জেলায়ও ভালো করি। এরপর পরিবার থেকেও সাহায্য করা হলো। বাগেরহাট সদর স্টেডিয়ামে প্র্যাকটিসে যাওয়ার জন্য বাইসাইকেল কিনে দিয়েছিলেন বাবা।

২০০৭ সাল। তখন দশম শ্রেণির ছাত্রী। সেবার জুনিয়র ন্যাশনাল কম্পিটিশনে ৪০০ মিটার দৌড়ে স্বর্ণপদক জয় করেন। তা ছাড়া ১০০ মিটার, ২০০ মিটার দৌড়, ১০০ মিটার হার্ডলস এবং বর্শা নিক্ষেপ এই চারটি ইভেন্টে দ্বিতীয় হয়েছিলেন। ২০০৮ সালে মানবিক বিভাগ থেকে এসএসসি পাস করেন। বাগেরহাটের সরকারি পিসি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন ২০১০ সালে। কলেজে থাকাকালে ৭৫ মিটার হার্ডলস ছাড়াও ১০০ ও ৪০০ মিটার দৌড়ে কলেজের আগের সব রেকর্ড ভেঙে দেন মিরোনা। এরপর সেখানেই ডিগ্রিতে ভর্তি হন।

২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত আন্ত: বিশ্ববিদ্যালয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ১০০, ২০০, ৪০০ মিটার দৌড় ও ১০০ মিটার হার্ডলসে মিরোনাকে টপকাতে পারেনি কেউই। অ্যাথলেটিকসের ট্র্যাক মাতিয়েছেন বিজেএমসি ও নৌবাহিনীর হয়ে। দূরপাল্লার দৌড়ে ৮০০, ১৫০০ ও ৩০০০ মিটারে জাতীয় আসরে মোট ১৩টি সোনা জিতেছেন।

দেশের নারী ফুটবলেও পরিচিত মুখ তিনি। মিরোনা ছিলেন জাতীয় দলের রক্ষণভাগের নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড়। ফুটবল খেলায় কিভাবে এলেন এর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে চলে গেলেন ২০০৮ সালের একটি দিনে, সেবার পিলু স্যার (একজন ক্রিকেট কোচ ইমতিয়াজ হোসেন পিলু) ফুটবল দল গঠন করবেন বলে খেলোয়াড় বাছাই করছেন। একদিন সেখানে ট্রায়াল দিতে এলাম। আমার খেলা মনে ধরে স্যারের। বললেন, কাল থেকে প্র্যাকটিস করতে এসো। সেই থেকে শুরু। এরপর খুলনা জেলা দলের হয়ে খেলতে আসেন ঢাকায়। সুলতানা কামাল মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সে ২১ দিনের একটা ক্যাম্প করলেন।

২০০৮ সালে খুলনার হয়ে তিনি ঢাকায় আসেন জাতীয় মহিলা ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে খেলতে। কমলাপুর বীরশ্রেষ্ট মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে মাতিয়ে সেরা ফুটবলারের পুরস্কার নিয়ে ঘরে ফিরেছিলেন মিরোনা। ভালো খেলার পুরস্কার হিসেবে ২০০৯ সালে এসএ গেমসের ক্যাম্পে ডাক পেয়েছেন। সেবার বাফুফের তত্ত্বাবধানে ৯ মাসের ক্যাম্প করিয়েছিলেন কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন। ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল টানা সাত বছর জাতীয় দলে সেবা দিয়েছেন। জাতীয় দলের হয়ে এসএ গেমস, অলিম্পিক বাছাই, এশিয়ান বাছাই খেলেছেন। ঘরোয়া ফুটবলে বিভিন্ন ক্লাবের হয়েও মাঠ মাতিয়েছেন। দেশের বাইরে লিগ খেলার অভিজ্ঞতাও আছে। ২০১৪ সালে মালদ্বীপের ঘরোয়া ফুটবলে বাংলাদেশের তিন নারী ফুটবলার অংশ নিয়েছিলেন। স্ট্রাইকার সাবিনা খাতুন, গোলরক্ষক সাবিনার সঙ্গে ছিলেন মিরোনাও। চুক্তিভিত্তিক অ্যাথলেট হিসেবে ২০১৪ সালে যোগ দিয়েছিলেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে। পারফরম্যান্স দেখে পরের বছরই নৌবাহিনী কর্তৃপক্ষ স্থায়ী করে মিরোনার চাকরি। দেশের ম্যারাথনেও অপ্রতিরোধ্য এক নাম মিরোনা। মাউন্টিং ম্যারাথনেও দেশের সেরা মিরোনা।

মিরোনার ছেলেদের কোচ হওয়ার গল্পটা বেশ চমকপ্রদ। খেলা ছেড়েই খেলোয়াড় তৈরির কাজে নেমে পড়েন মিরোনা। ২০১৩ সালে এএফসি সি লাইসেন্স ও ২০১৮ সালে এএফসি বি লাইসেন্স কোর্স করেন মিরোনা। নৌবাহিনীর সহযোগিতায় তিনি এখন পুরুষ ফুটবল দলের ডাগআউটে। প্রফেশনাল ফুটবলের দ্বিতীয় স্তর বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ বিসিএলের নতুন ক্লাব ঢাকা সিটি এফসির প্রধান কোচের দায়িত্ব নিয়েছেন মিরোনা। ২৬ বছরে তিনি ইতিহাস তৈরি করেছেন দেশের ফুটবলে। অন্যান্য ডিসিপ্লিনে ছেলেদের কোচিং করানোয় মেয়েদের অভিজ্ঞতা থাকলেও ফুটবলে আগে কখনো এ নজির ছিল না। মিরোনাই তৈরি করেছেন সেই নতুন ইতিহাস। খেলা ছেড়ে যেদিন কোচিং কোর্স শুরু করেছিলেন মিরোনা, সেদিন মনে পণ করেছিলেন বড় কোচ হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু এটা কখনো ভাবেননি যে কোচ হিসেবে অভিষেকটা হবে পুরুষ দলের ডাগআউটে। মিরোনার সামনে এ সুযোগটা এসেছে হঠাৎ করেই।

সিটি এফসির প্রস্তাবের আগে মিরোনাকে পেতে চেয়েছিল ভারতের একটি রাজ্য দল থেকে। তিনি সে প্রস্তাব রাখতে পারেননি বিপিএড পরীক্ষার কারণে। ভারতের ওই রাজ্য দলের দায়িত্ব নিলে মিরোনার যে এ যাত্রায় পুরুষ দলের প্রধান কোচ হয়ে ইতিহাস গড়া হতো না। সিটি এফসির কোচ আবু আবু নোমান এএফসি সি লাইসেন্সধারী। চ্যাম্পিয়নশিপ লিগের নিয়ম অনুযায়ী ক্লাবের প্রথম কোচ হতে হবে বি লাইসেন্সধারী। তাইতো এই ক্লাবের প্রধান কোচ হওয়ার প্রস্তাবটা পেয়ে যান মিরোনা। গত ডিসেম্বরে এই ক্লাবের কোচ হিসেবে যোগ দিয়েছেন জাতীয় নারী ফুটবল দলের সাবেক এ ডিফেন্ডার।

এখানেই থেমে থাকতে চান না মিরোনা। দাঁড়াতে চান আরো বড় লিগের ডাগআউটে। ঢাকা সিটি এফসি প্রিমিয়ার লিগে ওঠার লক্ষ্য নিয়েই দল গড়েছে। যদিও লিগের দলবদল শুরু হওয়ার মাত্র এক মাস আগে বাফুফে ক্লাবটিকে খেলার অনুমতি দিয়েছে। তাই অন্য ক্লাবগুলোর দল গোছানোর পর মাঠে নামতে হয়েছে তাদের। যে কারণে প্রত্যাশা অনুযায়ী দল তারা করতে পারেনি। প্রথম কোনো দলের প্রধান কোচ। তার ওপর আবার ছেলেদের। কোন সমস্যা অনুভব করছেন মিরোনা? কোনো সমস্যা নেই। ফুটবল তো ফুটবলই। সে পুরুষদের হোক আর মেয়েদের। আমি যখন অনুশীলন করাই তখন মনে করি ফুটবলারদের অনুশীলন করাচ্ছি। তারা ছেলে নাকি মেয়ে তা মাথায় নেই না।

আমার বিশ্বাস একজন ফুটবলারের সামনে তার কোচও পুরুষ কি নারী সেটা বিষয় না। সব খেলোয়াড়কেই সম্মান দিতে হবে কোচকে। তাহলেই শিখতে পারবে-বলছিলেন মিরোনা খাতুন। আমার কোনো সংকোচ নেই। এখানে আমি সম্পূর্ণ স্বাধীন। ছেলেরাও আমাকে খুব সম্মান করে। বলছিলেন মিরোনা। তিনি আরো বললেন, দায়িত্বটা বেশ উপভোগ করছি। প্রতিপক্ষের সঙ্গে পার্থক্য গড়ে দিতে মিরোনার প্রথম পছন্দ প্রেসিং ফুটবল। কোচিংয়ে আদর্শ মানেন গোলাম রব্বানী ছোটনকে।

নারী হয়ে পুরুষ ফুটবলারদের কোচিং। এটা বড় একটা চ্যালেঞ্জ। মিরোনা সেই চ্যালেঞ্জটা ভালোভাবেই নিয়েছেন। অনুশীলন করাতেও তার ভালো লাগছে। আমি চ্যালেঞ্জিং এ দায়িত্বটাকে বেশ উপভোগ করছি। ঢাকা সিটি এফসি দলে অনেক ভালো মানের ফুটবলার আছেন। আশা করি, এ দলটিকে প্রিমিয়ারে তুলতে পারবো। আর তাহলে তো বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের কোচ হিসেবে কাজ করতে পারবো -কথাগুলো বলতে গিয়ে নিজের আরো বড় স্বপ্নের জালবোনার গল্প শোনালেন ইতিহাস গড়া মিরোনা। বসে নেই মিরোনা। বর্তমানে উত্তরা ইউনিভার্সিটিতে বিপিএড করছেন।

ফুটবলার হিসেবে দেশে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলো ছড়ানো মিরোনার স্বপ্ন কোচ হিসেবেও নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া।

Share