ঢাকার দুরবস্থার জন্য জবাবদিহির অভাবই দায়ী

ঢাকার দুরবস্থার জন্য জবাবদিহির অভাবই দায়ী

সাক্ষাৎকারে স্থপতি ইকবাল হাবিব

পাঠকের কন্ঠ ডেস্ক
স্থপতি ইকবাল হাবিব। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন- বাপার যুগ্ম সম্পাদক। বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ। স্থাপত্যবিষয়ক বেসরকারি উদ্যোগ ভিত্তির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। স্থাপত্য নকশার জন্য তিনি বহুবার পুরস্কৃত হয়েছেন। পড়াশোনা করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) স্থাপত্য বিভাগে। বসবাসযোগ্য নগর হিসেবে ঢাকার নিরাপত্তা, পরিবহন ব্যবস্থা এবং নাগরিক সেবার মান নিয়ে কথা বলেছেন গণমাধ্যমের সঙ্গে।

প্রশ্ন: লন্ডনভিত্তিক ম্যাগাজিন দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জরিপে গত বছরও বসবাসের অনুপযোগী নগরীর তালিকায় প্রথম সারিতে ছিল ঢাকা। সম্প্রতি অগ্নিকা-ের কয়েকটি ঘটনায় প্রাণহানি এ শহরের বসবাস যোগ্যতা নিয়ে আবারো প্রশ্ন উঠেছে। আপনার বক্তব্য কী?

ইকবাল হাবিব: ইকোনমিস্টের আলোচ্য প্রতিবেদনসহ এ ধরনের প্রতিবেদন বা জরিপে শুভঙ্করের ফাঁকি হচ্ছে। তারা জনঘনত্ব বিবেচনার মধ্যে নেয় না। যেমন- বসবাসের উপযোগী প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা বা অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন শহরে যদি ৩০ লাখ মানুষ ঢুকিয়ে দেয়া হয়, তাহলে শহরটি বিপর্যস্ত শহরে পরিণত হবে; বসবাস যোগ্যতায় এর অবস্থান দ্রুত নেমে যাবে। বলা হয়, ঢাকা শহরের কোনো কোনো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৪৭ হাজার মানুষ বসবাস করে। এ রকম একটা ঘনবসতিপূর্ণ সংখ্যার শহরে শুধু সেবার মাত্রা দিয়ে বসবাস যোগ্যতা পরিমাপ করা যাবে না।

প্রশ্ন: তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন, বসবাস যোগ্যতায় ঢাকার প্রকৃত অবস্থান জরিপের অবস্থানের চেয়ে উচ্চতর?
ইকবাল হাবিব: না, আমি সেটা বলছি না। জনসংখ্যার বাইরে অন্যান্য সূচক বিবেচনা করলেও দেখা যাবে, ঢাকা অনেক পিছিয়ে। কিন্তু আমি বলতে চাচ্ছি, ঢাকা অনেক বেশি মানবিক শহর। ২১ ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরি কিংবা পহেলা বৈশাখে সেটা অনুভব করা যায়। নারী-পুরুষের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ, সাংস্কৃতিক বন্ধন, ঐতিহ্যের প্রতি গভীর মমত্ববোধ, ভালোবাসার মাধ্যমে পুরো নগরী প্রমাণ করে, এখানকার মানুষ কতটা মানবিক, কতটা সাংস্কৃতিক। মূল সংকট হচ্ছে সমন্বয়হীনতা ও জবাবদিহির অভাব। আপনি দেখবেন, এখানে ব্যক্তি পর্যায় থেকে সামষ্টিক- সব ক্ষেত্রেই সমন্বয়হীনতা রয়েছে।

প্রশ্ন: এ পরিস্থিতি কি হঠাৎ তৈরি হয়েছে?
ইকবাল হাবিব: না, স্বাধীনতা-উত্তর হঠাৎ করে হয়ে যাওয়া এই রাজধানী শহরটি দ্রুততম সময়ে এককেন্দ্রিক হয়েছে। প্রশাসনিক ব্যবস্থা, ক্রীড়া, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, বাণিজ্য, ব্যবসা, শিক্ষা, সবকিছুই এমনভাবে ঢাকায় কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে যে, সবকিছুর জন্য ঢাকামুখী স্রোত প্রবল থেকে প্রবলতর হয়েছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, এখন ঢাকা মানেই বাংলাদেশ।

প্রশ্ন: কিন্তু আমরা তো বেশ কিছু পরিকল্পনা ও মহাপরিকল্পনাও দেখেছি।
ইকবাল হাবিব: আপনি ঠিকই বলেছেন। আশির দশকের পর ঢাকা যখন আনুভূমিক ও উলম্ব^ভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছিল, তখনই ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে তবু সুধীজনের সমন্বয়, নিয়ন্ত্রণ কিংবা বিবেকবোধ ছিল। কিন্তু পরে যখন এটা প্রশাসনের একক এখতিয়ারভুক্ত সংস্থায় পরিণত হলো, তখনই পরিস্থিতি খারাপ হতে লাগলো।

সীমিত ভূমিতে প্রতিবেশ-পরিবেশ সংরক্ষণ করে বসবাস যোগ্যতা বাড়ানো এমনিতেই জটিল। তার ওপর প্রতিদিন বিপুল মানুষ ঢাকামুখী হচ্ছে। এ রকম একটা নগরীর উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় যেখানে শক্তিশালী, নিরপেক্ষ, দক্ষ, কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনবল থাকার কথা, সেটা একেবারে বিবেচনার বাইরে রাখা হলো। নগরীর উন্নয়ন প্রক্রিয়া কেবল উচ্চবিত্ত শ্রেণির তুষ্টিতে ব্যবহূত হলো।

বড় কথা, উন্নয়নের দায়িত্ব দেওয়া হলো সবচেয়ে নতজানু, পক্ষপাতদুষ্ট, জবাবদিহিবিহীন সংস্থা রাজউকের হাতে। ফলে আবাসন, শপিং সেন্টার, বহুতল ভবন- এগুলো চরম অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠতে লাগল। অন্যদিকে ১৯৫৯ সালে ঢাকার যে মহাপরিকল্পনা করা হয়েছিল, সেটার আধুনিকায়নের চেষ্টা শুরু হয় ১৯৯৭ সাল থেকে। ঢাকা নিয়ে ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানের কাজ শেষ হয় ২০১০ সালে। কিন্তু ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এখনো আমরা এক পাও এগোতে পারিনি।

প্রশ্ন: সার্বিক অব্যবস্থাপনা থেকেই কি অগ্নিকা-ের মতো ঘটনাগুলো ঘটছে?
ইকবাল হাবিব: অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম থেমে। যেমন বনানীর এফ আর টাওয়ারে আগুনের ঘটনা ঘটেছে; কিন্তু মানুষ সংকেত পায়নি। অথচ এ রকম ক্ষেত্রে ভবনে তিনটি বিষয় থাকা জরুরি। তা হলো- আগুনের সংকেত, নির্গমন ও নির্বাপক ব্যবস্থা। ওই ভবনে যদি অগ্নিসংকেতের ব্যবস্থা থাকত, তাহলে এতো প্রাণহানির ঘটনা ঘটতো না। প্রতি তিন মাস পরপর ফায়ার সার্ভিস শুধু নোটিশ না পাঠিয়ে যদি নির্গমনের জন্য মহড়ার আইন বাস্তবায়ন করতে বাধ্য করতো, তাহলে মানুষ জানতো কোথা দিয়ে কীভাবে নামতে হবে।

প্রশ্ন: চুড়িহাট্টা ও বনানী অগ্নিকা-ের পর আইনের প্রয়োগ দৃশ্যমান হচ্ছে। সংশ্নিষ্ট ভবনের মালিকদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বহুতল ভবনগুলো পরিদর্শন শুরু হয়েছে। আমরা সুফল পাবো?
ইকবাল হাবিব: হঠাৎ করে অভিযান, গ্রেফতার এবং এর ধারাবাহিকতায় কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হলো; অথচ মূল কাজটা করা হলো না। তাহলে কোনো লাভ হবে না। ২৪টি দল দিয়ে ১৫ দিনের যে ম্যাজিক সরকার দেখানোর চেষ্টা করছে, তা যে একবারে শূন্য ফল দেবে, এটা বলাই বাহুল্য। এখন যে অভিযান চলছে, তাতে হয়তো হাজার বা শত শত আটক লোক হবে; কিন্তু একজনকেও ধরে রাখা যাবে না। তখন বিষয়টা এমন দাঁড়াবে- মূল ব্যাপারটা সংশোধনই হবে না।

প্রশ্ন: আপনার মতে মূল বিষয় তাহলে কী? সরকারের কী করা উচিত ছিল?
ইকবাল হাবিব: সরকারের উচিত ছিল এক মাস সময় দিয়ে ভবন মালিকদের বলা, তার ভবনে ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী অগ্নিনির্বাপক ও অগ্নিনির্গমন ব্যবস্থা রয়েছে কি-না সেই সনদ দাখিল করতে। দরকার হলে পোস্টার লাগানো, সামাজিক মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া, ভবনের কী কী বিষয় চেক করতে হবে। পুরো প্রক্রিয়ায় পেশাজীবীদের যুক্ত করা উচিত ছিল। এ কাজটা করলে এই এক মাসে মানুষের সচেতনতা, অংশগ্রহণ এবং ভবনগুলো পরিশীলিতকরণের মধ্য দিয়ে জীবন বাঁচানোর মৌলিক কাজটা হয়ে যেত।

প্রশ্ন: আমরা যখন অগ্নিকা- নিয়ে ব্যস্ত, তখন রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনাও বেড়েছে।
ইকবাল হাবিব: সবকিছুর জন্যই জবাবদিহি না থাকার সংস্কৃতিই বেশি দায়ী। সড়কের শৃঙ্খলায় রয়েছে চারটি পক্ষ- যাত্রী, পরিবহনের ফিটনেস, পরিবহনের চালক এবং পরিবহন ও সড়কের শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা। যার ওপর নির্ভর করে পুরো প্রক্রিয়া চলছে, সেই যাত্রীরাই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বঞ্চিত, নিগৃহীত। আর যারা পরিবহন চালিয়ে ব্যবসা করেন, পেশা হিসেবে নিয়েছেন, তারা কা-জ্ঞানহীন, কৃতজ্ঞতাহীন। সেবার মান বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও অনাগ্রহী। পরিবহন খাতের শৃঙ্খলা ফেরানো যাদের দায়িত্ব, তারা সহযোগিতা দিচ্ছেন যাত্রীদের বদলে পরিবহন মালিক ও চালকদের। যাত্রীদের বঞ্চিত করে এই দুই পক্ষ ঘুষ, চাঁদাবাজি, শেয়ারের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। কাজেই এই সেবা খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকারকে যাত্রীর স্বার্থে মাঝখানের দুই সেক্টরকে কঠিনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সড়ক ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে।

প্রশ্ন: পরিবহন ছাড়াও আমাদের সড়ক ব্যবস্থার কাঠামোও কি পথচারী বা যাত্রীবান্ধব?
ইকবাল হাবিব: পুরো শহরকে যদি পথচারীবান্ধব করা যায়, তাহলে কম বিনিয়োগে অনেক বেশি মানুষ উপকৃত হবে। নগরকে পথচারীবান্ধব করতে বিনিয়োগ আছে ৯শ’ কোটি টাকা। অথচ এই নগরে এলিভেটেড এক্সপ্রেস প্রকল্প আছে ৩৫ হাজার কোটি টাকার, মেট্রোরেলের জন্য বরাদ্দ আছে ৪০ হাজার কোটি টাকা। পথচারীবান্ধব করলে অনেক মানুষ ছোট ছোট দূরত্ব হেঁটেই যেতে পারে, যানজটে পড়তে হয় না। পথচারীবান্ধব মানে শুধু ফুটপাত নয়। তার জন্য গাছ, খাবার পানি, প্রক্ষালন কেন্দ্র, মাঝেমধ্যে বসার জায়গা থাকবে। সড়কের নকশা, বিনিয়োগ, পরিকল্পনা এবং প্রাধিকারের যে বিষয়গুলো আছে, সেগুলো যথাযথভাবে না করলে দুর্ঘটনা রোধ করা যাবে না।

প্রশ্ন: কিছু কিছু এলাকায় চক্রাকার বাস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটা কতটা সুফল দেবে?
ইকবাল হাবিব: প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের পেছনে থেকে আমরা পেশাজীবীরা এই বাস চালুর উদ্যোগ নিয়েছিলাম। এর আগে রিকশাগুলোকে প্রধান সড়ক থেকে সরিয়ে এলাকাভিত্তিক চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু ধানম-ি থেকে নিউমার্কেট এলাকায় এখনও রিকশা চলছে। হঠাৎ করে এভাবে বাস চালু করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বিষয়গুলোর জন্য পেশাজীবীভিত্তিক সিদ্ধান্তে আসতে হবে। এ জন্য স্থপতি, নগর পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী সবাইকে নিয়ে বসতে হবে।

প্রশ্ন: বসবাসযোগ্য নিরাপদ নগরের জন্য কী করতে হবে?
ইকবাল হাবিব: সরকার, বিভিন্ন সংস্থা এবং নাগরিকদের মধ্যে একটা জবাবদিহিমূলক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সরকার যদি সত্যিকার অর্থে চায় এই নগরী বসবাসযোগ্য করবে, তাহলে সবক্ষেত্রে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। সূত্র: সমকাল।

Share