তুরাগতীরের অবৈধ ১০তলা ভবন ভাঙতে কেনো এই কালক্ষেপন?

তুরাগতীরের অবৈধ ১০তলা ভবন ভাঙতে কেনো এই কালক্ষেপন?

*পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর জোরালো জিজ্ঞাসা

*বিআইডব্লিউটিএর একাধিক বড় কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
*উচ্ছেদ অভিযানের অর্জন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকবে : তিন সংগঠন
*নৌ মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে দেড় মাসেও সাড়া নেই রাজউকের

নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকার চারপাশের নদীগুলো রক্ষায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) দীর্ঘ মেয়াদে বেশ বড়সড় অভিযান শুরু করেছে।

ফেব্রুয়ারির প্রথম দিক থেকে শুরু হওয়া কয়েক পর্বে চলমান অভিযানে এ পর্যন্ত বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ পাড়ের পাঁচ সহস্রধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে বিআইডব্লিউটিএ।

এর মধ্যে সরকারদলীয় এক প্রভাবশালী সাংসদ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক আইনজীবীর নিকটাত্মীয়র পাকা ভবনসহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পাঁচতলা, চারতলা, তিনতলা, দোতলা ও একতলা ইমারত রয়েছে।

পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোসহ বিভিন্ন মহল থেকে বিআইডব্লিউটিএর এই অভিযানকে এ যাবতকালের সব চেয়ে বড় ও সাহসী বলে উল্লেখ করেছে। তবে সব মহলসহ সাধারণ মানুষের কাছে প্রশংসিত এ অভিযান শেষপর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যাবে বলেও ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।

রাজধানীর হাজারীবাগে তুরাগ নদের তীরে অবৈধভাবে নির্মিত ১০তলা ভবনটি গত আড়াই মাসে অপসারণ না করায় জনমনে দেখা দিয়েছে এ প্রশ্ন এবং দিনদিন তা জোরালো হচ্ছে।

তিনটি পরিবেশবাদী বেসরকারি সংগঠনের দাবি, বহুল আলোচিত ভবনটি উচ্ছেদ না করা হলে বিআইডব্লিউটিএর এতোবড় অভিযানের সকল অর্জন ও প্রশংসা শেষপর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।

এছাড়া আলোচিত অবৈধ ১০তলা ভবনটি ভাঙতে সহযোগীতার জন্য একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট চেয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (রাজউক) চিঠি দিয়েছে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়।

রাজউক চেয়ারম্যান বরাবর লেখা নৌ মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মো. আনোয়ারুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, “নদীর পাড়ে ফোরশোর বহির্ভুত কিছু বহুতল ভবন নির্মিত হয়েছে, যেগুলো বিআইডব্লিউটিএ থেকে অনাপত্তির ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি এবং রাজউক থেকেও নকশা অনুমোদন করা হয়নি।

উল্লেখিত অননুমোদিত ভবনসমূহ ও অবৈধ স্থাপনা অপসারণের জন্য রাজউক কর্তৃক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানানো হলো।”

তবে গত ৩ মার্চ নৌ মন্ত্রণালয় ওই চিঠি পাঠালেও রাজউক এ পর্যন্ত কোনো ম্যাজিস্ট্রেট পাঠায়নি। এমনকি রাজউক দীর্ঘ দেড় মাসেও চিঠির জবাব দেয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদের সংযোগস্থলে হাজারীবাগের হাইক্কার খালের কাছে স্থাপিত ভবনটির মালিক ১৭ ব্যক্তি; যাঁদের বাড়ি বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলে বলে জানা গেছে। এই ভবনের রাজউক অনুমোদিত কোনো নকসা নেই, যে জমির ওপর ভবনটি নির্মিত সেই জমির বৈধ মালিকনাও নেই। অথচ নদীর কাছে অবৈধভাবে এটি নির্মাণ করা হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, অবৈধ ১০তলা ভবনটির মালিকদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে খোদ বিআইডব্লিউটিএর কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এ ব্যাপারে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। তাঁরা বলে বেড়াচ্ছেন, এ ভবনটি ভাঙার এখতিয়ার তাদের নেই। তাদের মধ্যে সংস্থার বন্দর বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম এবং ক্রয় ও সংরক্ষণ বিভাগের পরিচালক মফিজুল ইসলাম রয়েছেন বলে জানা গেছে।

এছাড়া বিআইডব্লিউটিএর বন্দর বিভাগের পরিচালক মো. শফিকুল ইসলামের ভূমিকা উচ্ছেদ অভিযানের শুরু থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ।

প্রথম পর্বের অভিযানের শেষ দিনের আগের দিন ১৯ ফেব্রুয়ারি দুপুরে এই কর্মকর্তা টেলিফোনিক নির্দেশে ঢাকা নদীবন্দর ইনচার্জ ও সংস্থার যুগ্ম পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিনকে অভিযানস্থল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রধান কার্যালয়ে তলব করেন। অথচ ওইদিন তুরাগতীরের বহুল আলোচিত অবৈধ আমিন মোমিন হাউজিং কোম্পানির স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করার কথা ছিল। অবৈধ ১০তলা ভবনটিও তার কাছাকাছি অবস্থিত।

চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় সেদিন গণমাধ্যমজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। প্রায় সকল টেলিভিশন চ্যানেলের টকশোতে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। কঠোর সমালোচনা করা হয় বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক শফিকুল ইসলামের।

নদীতীরের অবৈধ ভবন ভাঙতে সহায়তার জন্য ম্যাজিস্ট্রেট চেয়ে রাজউক চেয়ারম্যানকে নৌ মন্ত্রণালয়ের চিঠি

বিষয়টি নৌ প্রতিমন্ত্রীসহ মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অবহিত হন।

যদিও নৌ প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশে ও অতিরিক্ত নৌসচিব অনল কান্তি দাসের হস্তক্ষেপে পরেরদিন আমিন মোমিন হাউজিংয়ের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শুরু হয় বলে সূত্র জানায়। এমনকি শফিকুল ইসলাম নিজেই সেদিন অভিযানস্থলে উপস্থিত থাকেন।

একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে, নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে গত ২০ ফেব্রুয়ারি বিআইডব্লিউটিএ-তে যোগদান করেছেন কমডোর এম মাহবুব-উল ইসলাম।

বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর এই চৌকস কর্মকর্তা অত্যন্ত নীতিবান হলেও তিনি দায়িত্ব গ্রহণের আগেই শুরু হয় নদীতীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান। ফলে পুরো বিষয়টি সম্পর্কে তিনি আগে থেকে ওয়াকিবহাল ছিলেন না।

এছাড়া স্বল্পদিনের মধ্যে এতো বড় সংস্থার সব বিষয় রপ্ত করাও তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। এ সুযোগে কাজে লাগাচ্ছেন কয়েকজন সুযোগসন্ধানী কর্মকর্তা। তাঁরা অবৈধ ১০তলা ভবনটি ভাঙার বিষয়ে চেয়ারম্যানকে আগ্রহী করে তোলা থেকে বিরত রয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, ক্রয় ও সংরক্ষণ বিভাগের পরিচালক মফিজুল ইসলাম চলমান উচ্ছেদ অভিযানের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত বিআইডব্লিউটিএর একাধিক কর্মকর্তাকে ভবনটি না ভাঙার জন্য অনুরোধ করেন। তবে এ বিষয়ে মফিজুল ইসলামের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বিআইডব্লিউটিএর বন্দর বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনিও ভবনটি না ভাঙার পক্ষে অনানুষ্ঠানিক অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলে বেড়াচ্ছেন, ভবনটি নদীর সীমানায় পড়েনি, তাই এটি ভাঙার এখতিয়ারও বিআইডব্লিউটিএর নেই।

প্রসঙ্গত, উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আন্ত:মন্ত্রণালয় বৈঠকের সিদ্ধান্তে রাজধানীর চারপাশের পাঁচ নদীকে দূষণ ও অবৈধ দখলমুক্ত করার অভিযান শুরু করে বিআইডব্লিউটিএ। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে শুরু হয় বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যক্রম; যা চলমান রয়েছে।

সৈয়দ আবুল মকসুদ যা বলেন
বিশিষ্ট লেখক, গবেষক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, অবৈধ ১০তলা ভবনটি অবশ্যই ভাঙতে হবে। রাজধানীর গা- ঘেষে প্রবাহিত বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের পাড়ে এমন অবৈধ স্থাপনা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।

‘বিআইডব্লিউটিএ ভবনটি ভাঙতে কেনো গড়িমসি করছে’ এমন প্রশ্ন রেখে বিশিষ্ট এই নাগরিক বলেন, রাজউক অনুমোদিত নকশা, বিআইডব্লিউটিএর অনাপত্তির ছাড়পত্র ও জমির বৈধ মালিকানা ছাড়া নদীতীরের যেকোনো স্থাপনা বিআইডব্লিউটিএ নোটিশ ছাড়াই যেকোনো সময়ে ভেঙে ফেলতে পারে।

বিজিএমইএ ভবনের মতো সুরম্য অট্টালিকা যদি রক্ষা না পায় তাহলে ব্যক্তি মালিকানাধীন ভবনটিও অবশ্যই অপসারণ করতে হবে বলে মন্তব্য করেন সৈয়দ আবুল মকসুদ।

তিন সংগঠনের বিবৃতি
অবিলম্বে ভেঙে দেয়ার দাবি জানিয়েছে তিনটি বেসরকারি সংগঠন। ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে বিআইডব্লিউটিএর চলমান অভিযানকে ইতিবাচক মন্তব্য করে দেশের সকল নদী রক্ষায় এই অভিযান সারা দেশে বিস্তৃত করার দাবিও জানিয়েছে সংগঠনগুলো। গত ৬ এপ্রিল তিন সংগঠনের নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে সরকারের কাছে এই দাবি জানান।

বিবৃতিতে বলা হয়, বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে বিআইডব্লিউটিএর দীর্ঘমেয়াদি অভিযানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পাকা ভবনসহ ছোট- বড় মিলিয়ে পাঁচ হাজার স্থাপনা অপসারণ করা হলেও এ দুটি নদীর সংযোগস্থলে হাজারীবাগের হাইক্কার খালের কাছে বহুল আলোচিত ১০তলা ভবনটি গত দু’মাসেও ভাঙা হয়নি।

রাজউক অনুমোদিত নকসা ও জমির বৈধ মালিকনা ছাড়া নদীর কাছে নির্মিত সম্পূর্ণ অবৈধ ভবনটি অক্ষত থাকলে বিআইডব্লিউটিএর সাহসী ও প্রশংসনীয় এই অভিযান প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যাবে।

বিবৃতিতে নদ-নদীরক্ষা ও নৌ পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে জনগণকে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের জন্য যতোদ্রুত সম্ভব ভবনটি ভেঙে ফেলার জোর দাবি জানানো হয়।

বিবৃতিদাতারা হলেন গ্রিন ক্লাব অব বাংলাদেশের (জিসিবি) সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা নুরুর রহমান সেলিম, নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সভাপতি হাজী মোহাম্মদ শহীদ মিয়া এবং রোড্স, রেলওয়েজ এন্ড শিপিং রিপোর্টার্স ফোরামের (আরআরএসআরএফ) সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে।

 

Share