দারিদ্র কাকে বলে শৈশবে দেখেছি: ডা. মেরী

দারিদ্র কাকে বলে শৈশবে দেখেছি: ডা. মেরী

গরীবদের বিনা খরচে সেবা দেয়া চিকিৎসকের উপলব্ধি

সালাহ উদ্দিন কামাল
ডাক্তার মেরীর সঙ্গে এক চিকিৎসক সম্মেলনে আমার প্রথম দেখা। সম্মেলন ছিল তার শহরে, তারই হাসপাতালে। তাকে আমি চিনতাম না। চিনবার কথাও নয়। কতো ডাক্তারই এসেছেন সম্মেলনে। তাকে আলাদা করে চিনবোই বা কেনো! কিন্তু তার কিছু কাজ, ব্যক্তিত্ব আমাকে চিনিয়ে দিলো মেরীকে।

প্রথম দেখায় দেখলাম, তার সঙ্গে কিছু মানুষ। দেখলেই বোঝা যায়, মানুষগুলো দরিদ্র। এক বয়স্ক নারী তো হাসপাতাল চত্বরেই হাঁটু গেড়ে বসে তাকে প্রণাম করে বসলেন। অবাক হলাম দৃশ্যটি দেখে। সূত্র: অনলাইন পোর্টাল ‘ডাক্তার প্রতিদিন’।

কিন্তু ডাক্তার মহিলাটি তাকে জড়িয়ে ধরে তুললেন। খুব যেন বকে দিলেন, ওভাবে হাঁটু গেড়ে বসার জন্য, প্রণামের জন্য। তারপর সেখানে দাড়িয়েই প্রেসক্রিপশন করে দিলেন। নিজেই লম্বা লম্বা পায়ে ওষুধের কাউন্টার পর্যন্ত গেলেন। যোগাড় করে দিলেন ওষুধগুলো। কি এক অজানা আকর্ষণে আমি পুরোটা অনুসরণ করছিলাম।

বয়স্ক মহিলার চোখে তখন জলধারা। তারপরই আরো অবাক দৃশ্য। দেখলাম, ওই বয়স্ক নারীই শুধু নয়, তার সঙ্গের নানা বয়সী মানুষগুলো মাটিতে বসে তাকে প্রণাম করলেন। ডা. মেরী এবার আর বকলেন না। রীতিমতো তেড়ে গেলেন মানুষগুলোর দিকে। তারপর তাদের মাটি থেকে তুলে গা পুছিয়ে নমস্কার করলেন। আর দক্ষিণ ভারতীয়রা মাথা নেড়ে নেড়ে স্মিত হাসিমুখে কিছু বললেন। বিদায় দিলেন রোগীদের।

এমন দৃশ্য আমি ঢাকাতেও দেখেছি। একজন বড় মন্ত্রীকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে স্টেথিসকোপ দিয়ে দেখছিলেন মহাবিনয়ী এক ডাক্তার অধ্যাপক।
কিন্তু এই নারী চিকিৎসক অন্যরকম। তিনি তো মন্ত্রী- ফন্ত্রী দেখেন না। দেখেন মন্ত্রীরা যাদের ভোটে নির্বাচিত হন, তাদেরকে।

এরপর ভদ্রমহিলার সঙ্গে আলাপও হয়েছে। অত্যন্ত বিনয়ী এবং ঋজু। টুকটাক কথাবার্তাও হয়েছে সম্মেলনে। অন্যদের কাছে আলাপেও তার সম্পর্কে কিছু জেনেছি।

মানবদরদী এই চিকিৎসকের তার পুরো নাম ডা. মেরী পুনেন। তিনি এ রকমই। হাসপাতালে যখন চলেন, তখন অনেক গরীব রোগী তার পেছন পেছন ছোটে।

তিনি বিরক্ত হন না। বরং যেটা সম্ভব, রাস্তাতে দেখেন। ওষুধপত্র যোগাড় করে দেন। প্রয়োজনে নিজে থেকে কিনেও দেন। হাসপাতালে তার যে রুম, তার বাইরে রোগীদের ভিড় থাকেই। তিনি অক্লান্তভাবে রোগী দেখেন।

এ কাহিনি কেরালার কোচি শহরের। সেখানে ডা. মেরীর নিজস্ব চেম্বারও আছে। রোগীদের কাছ থেকে ফিস নেন। তবে রোগী গরীব হলে এক পয়সাও নেন না। নিকট বন্ধু ডাক্তারদের কাছে হেসে বলেন, বড় লোক রোগীদের কাছে ফিস নিয়ে পুষিয়ে নিই।

এ পর্যন্ত কতো হাজার গরীব রোগী বিনা ফিসে দেখেছেন তিনি, তার ইয়ত্তা নেই। তবে তাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে কিংবদন্তি। কেরালার মানুষ বলে, ডা. মেরীর কাছে গরীব রোগী জীবন পায়। তিনি গরীবদের বাঁচান। তিনি দেবী।

মেরী এমনটা করেন। তিনি গরীব পরিবার থেকে অনেক কষ্টে ডাক্তার হয়েছেন। তার নিকটাত্মীয় অনেকে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছে। সেসব মেরী ভোলেননি। শৈশবে, কৈশোরে, ডাক্তার হওয়ার সময় প্রচুর কষ্ট করেছেন। দেখেছেন, রোগী গরীব হলে বাঁচে না। তাই সেটা মনে রেখেই তিনি গরীর রোগী বাঁচানোর সাক্ষাৎ দেবী।
ডা. সালাহ উদ্দিন কামাল: বাংলাদেশী চিকিৎসক

Share