ধলেশ্বরী: প্রমত্তার বুকে গো-চারণভূমি

ধলেশ্বরী: প্রমত্তার বুকে গো-চারণভূমি

আশীষ কুমার দে
ধলেশ্বরী নদী দেশের মধ্যভাগে দিয়ে প্রবাহিত একটি জলধারা। টাঙ্গাইল জেলার উত্তর পশ্চিম- প্রান্তে যমুনা হতে এর সূচনা। এরপর নদীটি দুই ভাগে ভাগ হয়ে উত্তরের অংশটি ধলেশ্বরী আর দক্ষিণের অংশটি কালীগঙ্গা নামে প্রবাহিত হয়।

এ দুটি শাখা নদী মানিকগঞ্জ জেলার কাছে একসঙ্গে মিলিত হয় এবং সম্মিলিত ধারাটি ধলেশ্বরী নামে প্রবাহিত হয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলার কাছে শীতলক্ষা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে পরবর্তী সময় মেঘনা নদীতে মিশেছে। ধলেশ্বরীর দৈর্ঘ্য ১৬০ কিলোমিটার।

তবে ধলেশ্বরী বর্তমানে যমুনার শাখা নদী হলেও প্রাচীনকালে এটি সম্ভবত পদ্মা নদীর মূল ধারা ছিলো। ১৬০০ হতে ২০০০ সালের মধ্যে পদ্মার গতিপথ ব্যাপকভাবে পাল্টে গেছে।

ধারণা করা হয়, কোনো সময়ে পদ্মার মূল ধারাটি রামপুর-বোয়ালিয়া এলাকা ও চলন বিলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পরে ধলেশ্বরী ও বুড়িগঙ্গা নদীর মাধ্যমে মেঘনায় গিয়ে পড়তো।

১৮ শ’ শতকে পদ্মার নিম্ন প্রবাহটি ছিলো আরো দক্ষিণে। ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মূল প্রবাহ ধলেশ্বরী হতে দক্ষিণের প্রবাহে, তথা কীর্তিনাশা নদীতে সরে যায়; যা বর্তমানে পদ্মার মূল গতিপথ।
সূত্র: Majumdar, Dr. R.C., History of Ancient Bengal, First published 1971, Reprint 2005, pp. 3- 4, Tulshi Prakashani, Kolkata, ISBN 81- 89118- 01- 3.

অতীত ও নিকট অতীতে ধলেশ্বরী নদীর অনেক গৌরবগাঁথা রয়েছে। রুই, কাতলা, আইড়, ভেউস ও চিতলসহ এ জাতীয় অসংখ্য প্রজাতির বড় বড় মাছ পাওয়া যেতো নদীতে। এমনকি ইলিশও পাওয়া যেতো ধলেশ্বরীতে।

নদীতে অসংখ্য কচ্ছপ আর শুশুকের ডিগবাজিতে তীরবর্তী মানুষের মন আন্দোলিত হতো। টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার উপজেলায় ধলেশ্বরীর পাড়ে ছিলো এলাসিন ঘাট। একসময় এ ঘাটটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।

একপাশে বিশাল পন্টুন; যেখানে ছিলো স্টিমারসহ বড় জাহাজ ভেড়ার ব্যবস্থা, কাছেই ছিলো নৌকা চলাচলের জন্য আলাদা খেয়াঘাট। এখান থেকে মানুষ নৌপথে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন করতো।

ধলেশ্বরী নদীর ঐতিহাসিক তাৎপর্যের কথা উল্লেখ করে গণতন্ত্রী পার্টির সভাপতিম-লীর সদস্য ও জন্মসূত্রে টাঙ্গাইলের নাগরিক নুরুর রহমান সেলিম বলেন, “এ নদীকে কেন্দ্র করে এলাসিন ঘাট এলাকায় গড়ে উঠেছিলো বাংলাদেশের অন্যতম বাণিজ্যকেন্দ্র।

ব্রিটিশ শাসনামলে ধলেশ্বরী নদীর এই ঘাট দিয়ে বড় বড় পাটের চালান নারায়ণগঞ্জ, কলকাতা এবং স্কটল্যান্ডের ডান্ডি যেতো। বহু ভারতীয় ও ব্রিটিশ ব্যবসায়ী নদীর আশপাশে ঘাট এলাকায় থাকতেন। এলাসিন খেয়াঘাট থেকে ধলেশ্বরীর বুক চিরে চলতো পাট বহনকারী বড় বড় জাহাজ; চলতো পণ্যবাহী বড় বড় নৌকা।”

মুক্তিযোদ্ধা নুরুর রহমান সেলিম বলেন, “ধলেশ্বরীর স্রোত একসময়ে এতো প্রবল ছিলো যে, কোনো নৌযান ডুবলে তার খোঁজ মিলতো না, অথবা অনেক পরে দূরে কোথাও সেটির অস্তিত্ব পাওয়া যেতো।”

এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ জানান, ৪০’র দশকের প্রথমদিকে আনুমানিক ৩০০ যাত্রী নিয়ে একটি লঞ্চ এলাসিন ঘাট থেকে সিরাজগঞ্জের উদ্দেশে ছেড়ে যায়।
ওই লঞ্চে বিয়ের উদ্দেশে রওনা হওয়া তিন বরসহ বরযাত্রীদল এবং বিয়ে করে নববধূকে নিয়ে বাড়ি ফিরছেন, এমন দু’জন বর ও তাঁর সঙ্গীরাও ছিলেন।

এলাসিন ঘাট ছেড়ে যাওয়ার পর ধলেশ্বরী- যমুনা মোহনার কাছে লঞ্চটি ডুবে যায়। এতে সলিল সমাধি ঘটে সকল যাত্রীর। সে সময় লঞ্চটির কোনো সন্ধানও পাওয়া যায়নি।

এর প্রায় ৬০ বছর পর সিরাজগঞ্জে মাটির গভীরে এর অংশবিশেষ পাওয়া গেছে। যমুনার বিভিন্ন স্থানে চর জেগে ওঠায় সেসব স্থানে জনবসতি গড়ে উঠেছে। তেমনি একটি জনপদে গভীর নলকূপ খননকালে সন্ধান মেলে লঞ্চটির ভাঙ্গা অংশের।
এই ঘটনা থেকেই বোঝা যায়, ধলেশ্বরী কতোটা প্রমত্ত ছিলো, মন্তব্য করেন মি. সেলিম।

প্রকৃত অর্থে, একসময় ধলেশ্বরী পার হতে রীতিমতো ভয় লাগতো। যেমন ছিলো প্রশস্ততা, তেমনি ছিলো স্রোত। যমুনা সেতুর টোল আদায় ঘরের এক সময়ের কর্মী স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ লোবান মিয়া।

তিনি জানান, তাঁর ছোটবেলায় এলাসিন ঘাট দিয়ে খেয়া পার (খেয়াঘাট থেকে নৌকায় পারাপার) হতে তিন ঘণ্টা সময় লাগতো। সত্তর বছর বয়সী লোবান মিয়ার এ বক্তব্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ধলেশ্বরীর প্রশস্ততা কতো ছিলো।

বিবিসি বাংলা-কে দেয়া এক সাক্ষাতকারে ধলেশ্বরী নদীর প্রবল স্রোত নিয়ে ১৯৭৮ সালের স্মৃতিচারণ করেন এলাসিন ঘাট এলাকার স্কুলশিক্ষক দেবাশিস সাহা। তিনি বলেন, “এমনও দিন গেছে যে নদী পার হওয়ার জন্য আসতাম, কিন্তু নদী পার হতে পারতাম না। নদীতে এতো স্রোত ছিলো। অনেক সময় নদীর ঘাটে কারো বাড়িতে রাত কাটিয়েছি। তার পরদিন স্রোত কমে গেলে পার হয়েছি।” তাই ধলেশ্বরী নদীর সঙ্গে ইতিহাস-ঐতিহ্য যেমন জড়িয়ে আছে, তেমনি জড়িয়ে আছে এখানে বেড়ে ওঠা প্রবীনদের জীবনের অনেক গল্প।

এককালের গৌরবোজ্জল অনেক অধ্যায়ের সাক্ষী সেই স্রোতস্বিনী ধলেশ্বীর আজ বড়ই করুণ দশা।

নৌ চলাচল তো দূরে থাক, এর বুকে এখন ফসলের ক্ষেত, সুরম্য অট্টালিকাসহ নানা স্থাপনা। আবার কোথাও মাইলের পর মাইল শুধু মাঠ। আর সেই মাঠ পরিণত হয়েছে গো-চারণ ভূমিতে।

ধলেশ্বরীর পানিতে স্রোত নেই, ঢেউ নেই। রুগ্ন মানুষের মতো কোনো রকমে বইছে। ইতিহাস-ঐতিহ্যমন্ডিত সেই এলাসিন ঘাটও আর নেই। ঘাটের নিকটে বিশাল মাঠ পার হলে কিছু দূরেই শামসুল হক সেতু। তার নিচে দিয়ে কালের সাক্ষী হিসেবে বয়ে চলেছে একটা সরু খাল।

ধলেশ্বরীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় দক্ষিণ টাঙ্গাইল এবং মানিকগঞ্জ জেলার লাখ লাখ মানুষ এর বিরূপ প্রভাবের শিকার হয়েছে।

তিন দশক আগেও ধলেশ্বরী তীরবর্তী এলাকায় ব্যাপকহারে আমন, আউশ ও বোরো ধানের চাষ হতো, প্রচুর পাট উৎপাদন হতো। নদীতে অফুরন্ত মাছ পাওয়া যেতো; উন্মুক্ত জলাভূমির সেই মাছ আহরণের ওপরই জেলে সম্প্রদায়ের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল ছিলো।

কিন্তু নদী শুকিয়ে যাওয়ার ফলে এসব কিছুই হয় না। পানির অভাবে আশেপাশের কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্ধ হয় জেলেদের মাছ ধরা। বদলে যায় বহু মানুষের জীবিকার পথ। এখন নতুন ধরনের ফসলের চাষ হচ্ছে- যেমন কলাই, বাদাম, ভুট্টা ইত্যাদি।

পাটচাষ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। মাছ তো নেই বললেই চলে। তাই বংশ পরম্পরায় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসা জেলেদের এখন চরম দুর্দিন, তাঁদের মাঝে আহাকার, আর্তনাদ।

তবে ধলেশ্বরীর মৃত্যুতে লাভবান হয়েছেন এমন মানুষও কম নয়। দেলদুয়ারের ‘তারক যোগেন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা কানিজ ফাতেমা নদীর মৃত্যুকে নতুন জমিপ্রাপ্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলেন, “পানি শুকিয়ে যাওয়ায় এখানে একটা জেলে পল্লী ছিলো। তাদের খুব দুর্দিন শুরু হয়। কিন্তু নদীর পাশে যারা আছে তাদের দিন ভালো হয়েছে। তাদের নতুন জমি হয়েছে”।

নদীর মৃত্যুতে জমি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে থেমেছে ভাঙনপ্রবণ গ্রামের মানুষের কান্না। সেখানকার অনেকে সড়কপথে যাতায়াতের সুবিধাও পেয়েছেন। কিন্তু মৎস্যজীবী মানুষের হাহাকার রয়েই গেছে।

প্রমত্তা ধলেশ্বরীর এই করুণ পরিণতি কেনো?
টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার এলাসিন বাজারের নিকটস্থ জেলে সম্প্রদায়ের প্রবীণ ব্যক্তিদের অভিযোগ, ধলেশ্বরীর মৃত্যুর জন্য দায়ী যমুনা সেতু। তাঁদের দাবির সূত্র ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। যমুনা বক্ষে বিশাল সেতু নির্মাণ ইতিহাসের ‘মাইল ফলক’ হিসেবে চিহ্নিত হলেও সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে চরম অদূরদর্শীতা মূলত ধলেশ্বরীকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দিয়েছে। সেতু নির্মাণের সময় ধলেশ্বরী চ্যানেলটি বন্ধ করে দেয়ায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

যমুনা সেতু নির্মাণর প্রকল্পের কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন কাজী মোহাম্মদ ফেরদৌস। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী।

তিনি বলেন, “যমুনা এবং ধলেশ্বরী দুটোই খুব পরিবর্তনশীল নদী। ৯০ এর দশকে যমুনা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের সময় ধলেশ্বরীর গতিপথ পরিবর্তন করার প্রবণতাকে ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেন সেতু নির্মাণের সঙ্গে জড়িত বিশেষজ্ঞরা। ঝুঁকি কমাতে তাই পাথর ফেলে পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হয় ধলেশ্বরী চ্যানেলটি”। সূত্র : বিবিসি বাংলা, ১৩ এপ্রিল ২০১৬।

ধলেশ্বরী নদীর মূল চ্যানেলটি বন্ধ হওয়ার পর নতুন আরেকটি শাখা তৈরি হয়েছে। সেটির পানিপ্র্রবাহ অব্যাহত রাখতে যমুনা সেতু নির্মাণের পর কিছু কাজ করার চেষ্টা হয়েছিলো। যদিও তা বেশিদূর এগোয়নি। তবে বর্তমান সরকার ধলেশ্বরীর মূল চ্যানেলটি ড্রেজিং করার কথা ভাবছে। কিন্তু তার অগ্রগতিও জোরালো নয়। এলাসিনসহ নদীতীরের বাসিন্দারের অভিযোগ, ধলেশ্বরীর জীবন ফেরাতে কখনোই কোন খননকাজ তারা দেখেননি। এই আক্ষেপ আর অভিযোগ- অনুযোগ সত্ত্বেও ধলেশ্বরীর পুনর্জীবন চান তাঁরা।

স্থানীয় জেলে ষাটোর্ধ্ব নিতাই রাজবংশী বলেন, “এখনতো শুনেছি নদী কাটা যায়। আমাদের ওরকম করে কেটে একটা নদী বের করে দিন। আমরা তাহলে একটু বাঁচি।” নিতাই রাজবংশীদের বাঁচার আর্তনাদের মধ্য দিয়ে বেঁচে উঠুক ধলেশ্বরী, ফিরে পাক তার হারানো যৌবন-এটাই প্রত্যাশা।

Share