নতুন সড়ক আইন কার্যকরে দীর্ঘসূত্রিতা

নতুন সড়ক আইন কার্যকরে দীর্ঘসূত্রিতা

দুর্ঘটনার ঝুঁকিমুক্ত সড়কের দাবিতে সোচ্চার বিভিন্ন মহল

অরুন দাস
অকাল প্রাণহানি রোধে দুর্ঘটনার ঝুঁকিমুক্ত সড়কের দাবিতে বিভিন্ন মহল এখনও সোচ্চার। তাদের দাবির মুখে আইন সংশোধন করে নতুন সড়ক পরিবহন আইন পাস হলেও তা কার্যকরে চলছে দীর্ঘসূত্রিতা। এ কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি প্রতিনিয়ত ঘটেই চলেছে। ফলে যে প্রত্যাশা নিয়ে তথা সড়ক দুর্ঘটনা সহনীয় মাত্রায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যে আইন সংশোধন করা হলেও সে প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না।

নতুন আইনে চালকের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি পাস নির্ধারণ করা হয়েছে। লাইসেন্স না থাকলে চালকের ছয় মাসের কারাদ- বা ২৫ হাজার টাকা জরিমানা হবে। দুই যানবাহনের পাল্লাপাল্লিতে দুর্ঘটনা ঘটলে চালকের তিন বছরের কারাদ- অথবা জরিমানা হবে ২৫ লাখ টাকা। আইন অমান্য করলে চালকের নির্ধারিত নম্বরও কাটা যাবে। একপর্যায়ে সব নম্বর কাটা গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে তাঁর লাইসেন্স।

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ও দুর্ঘটনা কমাতে এমন অনেক বিধানই রয়েছে নতুন সড়ক পরিবহন আইনে। কিন্তু সংসদে পাস হওয়ার প্রায় সাত মাস পেরোলেও আইনটি কার্যকর হয়নি। অথচ একই দিনে পাস হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসের সনদকে মাস্টার ডিগ্রি সমমান প্রদান আইন ইতিমধ্যে কার্যকর হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি নিয়ে সম্পাদক পরিষদ, সাংবাদিক সমাজ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উদ্বেগ জানালেও সরকার দ্রুত আইনটি কার্যকর করেছে।

গত বছরের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসের চাপায় দুই কলেজশিক্ষার্থী নিহত হন। সেদিন থেকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে সারা দেশে রাস্তায় নেমে আসেন বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর তড়িঘড়ি করে পাস করা হয় সড়ক পরিবহন আইন। এরপর আইনটির বেশ কয়েকটি ধারা সংশোধনের দাবিতে আন্দোলনে নামেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা। এতে আইনটি কার্যকরের বিষয়টি চাপা পড়ে যায়।

সরকার আইনটি কার্যকরের গেজেট প্রকাশ না করলেও সড়ক খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি একটি কমিটি করেছে। এই কমিটির নেতৃত্বে আছেন সাবেক নৌমন্ত্রী শাজাহান খান। তিনি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনেরও কার্যকরী সভাপতি। কমিটি ১১১ দফা সুপারিশের খসড়াও চূড়ান্ত করেছে। যদিও এসব সুপারিশের অধিকাংশই পুরোনো। বিভিন্ন সময় সরকারসহ নানা সংগঠন থেকে সুপারিশগুলো করা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

শীর্ষ দৈনিক প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করেন এমন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, সড়ক পরিবহন আইনটি কার্যকর না করতে সরকারের ওপর মালিক- শ্রমিকদের চাপ রয়েছে। এর ফলে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকারের সদিচ্ছার বিষয়টি প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

সংসদে পাস হওয়া সড়ক পরিবহন আইনের ১ (২) ধারায় বলা হয়েছে, সরকার গেজেটের মাধ্যমে যে তারিখ নির্ধারণ করবে, সেই তারিখে এই আইন কার্যকর হবে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, আইন কার্যকরের তারিখ ঘোষণা করে কোনো গেজেট না হওয়ায় আইনটি কার্যকর হচ্ছে না।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের সভায় সড়ক পরিবহন আইনটি কার্যকরের চ্যালেঞ্জ নির্ধারণ ও বাস্তবসম্মত সমাধানের জন্য তিনজন মন্ত্রীর সমন্বয়ে একটি কমিটি করা হয়। কমিটির সদস্যরা তাঁদের মতামত জানানোর পর আইনটি কার্যকরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কমিটি এখন পর্যন্ত কোনো সভাই করেনি।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব নজরুল ইসলাম বলেন, আইন কার্যকর না হওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলতেই পারেন। আইনটি কার্যকর করার বিষয়ে তিনজন মন্ত্রীকে নিয়ে একটি কমিটি করা হয়েছে। তাঁরা আলোচনা করে জানানোর কথা। সড়ক পরিবহনমন্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ায় প্রক্রিয়াটি একটু পিছিয়ে গেছে।

নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির (এনসিপিএসআরআর) তথ্য মতে, গত তিন মাসে এক হাজার ১৬৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় এক হাজার ২১২ জন নিহত ও ২,৪২৯ জন আহত হয়েছে। নিহতের তালিকায় ১৫৭ নারী ও ২১৫ শিশু রয়েছে। ১৯ মার্চ রাজধানীর নর্দ্দায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবরার আহমেদ চৌধুরী বেপরোয়া বাসের চাপায় নিহত হন। এরপর শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে আবারো রাস্তায় নামেন। আবারো আলোচনায় আসে সড়ক পরিবহন আইন কার্যকরের বিষয়টি।

আইন পাসের আগে-পরে বিরোধিতা
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২০০৯ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর যুগোপযোগী সড়ক পরিবহন আইন করার উদ্যোগ নেয়। একাধিকবার আইনের খসড়াও তৈরি করা হয়। প্রতিবারই খসড়া আইনের বিরোধিতা করেন পরিবহন মালিক- শ্রমিকেরা। তাঁদের বাধার মুখে সড়ক পরিবহন আইনটি পাস হচ্ছিল না।

বর্তমান সড়ক পরিবহন আইনটির খসড়া ২০১৭ সালের ২৭ মার্চ মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়। এই খসড়া সংশোধনের দাবিতেও দেশের বিভিন্ন জেলায় পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা ধর্মঘট করেন। আইনটি পাসের পর এর বেশ কয়েকটি ধারা সংশোধনের দাবিতে আন্দোলনে নামেন পরিবহন মালিক- শ্রমিকেরা। ৮ দফা দাবিতে গত বছরের ২৮ অক্টোবর থেকে সারা দেশে ৪৮ ঘণ্টার পরিবহন ধর্মঘট পালন করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন।

পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের দাবির মধ্যে রয়েছে সড়ক পরিবহন আইনের সব ধারা জামিনযোগ্য করা, সড়ক দুর্ঘটনায় শ্রমিকের অর্থদ- পাঁচ লাখ টাকার বিধান বাতিল করা, ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার শিক্ষাগত যোগ্যতা পঞ্চম শ্রেণি করা। মূলত তাঁদের চাপের কারণে আইনটি কার্যকর করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ আছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খোন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, আইনটি কার্যকর না করতে পরিবহন মালিক- শ্রমিকেরা কোনো চাপ দিয়েছেন, এ তথ্য ঠিক না। নতুন আইন তাড়াতাড়ি কার্যকর হোক, এটা মালিক- শ্রমিকেরাও চান।

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৮৩ সালের মোটরযান অধ্যাদেশে জরিমানা ও শাস্তির বিধান ছিল কম। নতুন সড়ক পরিবহন আইনে জরিমানা ও বিভিন্ন অপরাধে শাস্তি বাড়ানো হয়েছে। এই আইনে অপরাধের তদন্ত, বিচার, আপিল ইত্যাদি ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি প্রযোজ্য হবে। ফলে আইনটি কার্যকর হলে বেপরোয়া চালানো, অবৈধ লাইসেন্সধারী চালকদের দৌরাত্ব্য কমতো।

সড়ক পরিবহন আইনে বলা আছে, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হত্যার উদ্দেশ্যে প্রমাণিত হলে তা ফৌজদারি কার্যবিধির ৩০২ ধারার অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে, যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবে, বর্তমানে সারা দেশে ১৭ লাখের বেশি অবৈধ চালক রয়েছেন। নতুন আইনে বলা আছে, কোনো ব্যক্তির ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলে বা মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স ব্যবহার করে গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদ- বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হবে।

সড়ক দুর্ঘটনার বড় কারণ ওভারটেকিং (পাল্লাপাল্টি) সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী, সড়কে দুটি গাড়ি পাল্লা দিয়ে (রেসিং) চালানোর সময় যদি দুর্ঘটনা ঘটে, সে ক্ষেত্রে তিন বছরের কারাদ- অথবা ২৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। চলন্ত অবস্থায় চালক মুঠোফোনে কথা বললে এক মাসের কারাদণ্ড বা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে। গণপরিবহনে নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ও বয়োজ্যেষ্ঠদের জন্য সংরক্ষিত আসনে অন্যরা বসলেও একই শাস্তি রাখা হয়েছে।

বেপরোয়া চালানো বন্ধে পরিবহন আইনে চালকের জন্য রাখা হয়েছে ১২ পয়েন্ট, যা প্রতিটি অপরাধের পর কাটা যাবে। ৬ পয়েন্ট কাটা গেলে এক বছরের জন্য চালকের লাইসেন্স স্থগিত এবং সব পয়েন্ট কাটা গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে।

সড়ক পরিবহন আইন বিষয়ে বেসরকারি সংগঠন গ্রিন ক্লাব অব বাংলাদেশের (জিসিবি) সভাপতি নুরুর রহমান সেলিম বলেন, পরিবহন মালিক- শ্রমিকদের বিরোধিতায় আইনে চালকের সর্বোচ্চ সাজা ১০ বছরের বদলে ৫ বছর করা হয়েছে। তারপরও সংসদে পাস হওয়া আইন নিয়ে মালিক- শ্রমিকেরা আন্দোলনের নামে যাত্রীদের হয়রানি করেছেন। তিনি বলেন, নতুন সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সড়ক পরিবহন আইনটির যথাযথ প্রয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে আইনটিকে কার্যকর করতে হবে।

Share