মাদ্রাসাছাত্রীদের কাছে আতঙ্কের নাম সিরাজ

মাদ্রাসাছাত্রীদের কাছে আতঙ্কের নাম সিরাজ

* অধ্যক্ষের কক্ষে ডাক পড়লেই গায়ে শিহরণ উঠতো

ফিরোজ উদ্দিন
ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রীদের কাছে প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ (পুলিশের কাছে আটক) সিরাজ- উদ- দৌলা ছিলেন এক আতঙ্কের নাম। তাঁর কক্ষে কোনো ছাত্রীর ডাক পড়লেই শিহরিত হয়ে উঠতেন ওই ছাত্রী।

একই মাদ্রাসার ছাত্রী সন্তানসম নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিপীড়নের কয়েকদিনের মাথায় সাঙ্গপাঙ্গ দিয়ে নির্মমভাবে পুড়িয়ে হত্যার পর দেশজুড়ে সৃষ্ট গণবিস্ফোরণের প্রেক্ষাপটে সিরাজের বিরুদ্ধে অনেকেই মুখ খুলতে শুরু করেছেন। তাঁদের জবানীতেই বেরিয়ে আসছে কুলাঙ্গার অধ্যক্ষের সব অপর্কর্তির খতিয়ান।

সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার নৈশপ্রহরী মো. মোস্তফার ভাষ্যমতে, “’বছর পাঁচেক আগে হুজুরের (অধ্যক্ষ সিরাজ) কক্ষে একদিন ঢুকে লজ্জায় ডুবে যাই। এক ছাত্রীর সঙ্গে তাকে অশালীন অবস্থায় দেখে ভয় পেয়ে যাই। দৌড়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসি।

ভাবতে থাকি, ছোট চাকরি করি। হুজুরকে ওই অবস্থায় দেখে ফেলায় হয়তো কোনো অজুহাতে চাকরি খেয়ে ফেলবেন। পরে অবশ্য আমার চাকরি তিনি খাননি।

তবে ঘটনা প্রকাশ করলে চাকরি খাওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। এরপর থেকে ছোটখাটো ভুলত্রুটি হলেই শাসাতেন। আমি নৈশপ্রহরীর চাকরি করলেও আমাকে দিয়ে দিনেও কাজ করাতেন তিনি। তখন বুঝতাম, এটা হয়তো আমার দেখে ফেলার শাস্তি।”

নরপিশাচ অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে নৈশপ্রহরী মোস্তফার এ তথ্যের সত্যতা মেলে তাঁরই (সিরাজ) একান্ত বিশেষ সহকারি নুরুল আমিনের বক্তব্যে।

এছাড়া অনুসন্ধানেও বেরিয়ে আসে, শৈশব থেকেই নারীদের সঙ্গে তাঁর অশালীন আচরণের নানা কেচ্ছা। ফেনী সদরের গোবিন্দপুর ছিদ্দিকীয়া ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্র থাকাকালেও একাধিকবার অনৈতিক সম্পর্কে জড়াতে গিয়ে এলাকায় গণপিটুনি শিকার হয়েছেন তিনি।

নৈশপ্রহরী মোস্তফা নারীদের প্রতি সিরাজের যৌন হয়রানির আরো অন্তত তিনটি ঘটনার সাক্ষী। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে অধ্যক্ষ সিরাজের রুমে ডাক পড়লেই বিপদের গন্ধ পেতেন ছাত্রীরা।

নিপীড়নের শিকার অধিকাংশ ছাত্রী ভয়ে তা প্রকাশ করতেন না। কেউ কেউ পরিবার ও সহপাঠীদের জানালেও প্রভাবশালীদের মাধ্যমে তা ধামাচাপা দিয়ে ফেলতেন সিরাজ। আবার অধ্যক্ষের পোষা একটি বাহিনী বারবার সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি দেখাতো।

মোস্তফা ২১ বছর ধরে সোনাগাজী মাদ্রাসায় নৈশপ্রহরীর চাকরি করেন। চোখের সামনে অনেক কিছু দেখেছেন তিনি। পাঁচ-ছয় বছর আগের একটি ঘটনার বর্ণনায় তিনি বলেন, “হঠাৎ একদিন দুপুরে হুজুরের রুমে যাই। মাদ্রাসা তখন খোলা ছিল। কক্ষে ঢুকেই দেখি তিনি এক ছাত্রীর সঙ্গে অশালীন আচরণ করছেন। আমাকে দেখেই হুজুর আলমারির ভেতরে কিছু একটা খোঁজার ভান করেন। এমন দৃশ্য দেখার পর ভয়ে আমার হাত- পা কাঁপছিল।”

মোস্তফা আরো বলেন, পরেরদিন অধ্যক্ষ তাঁেক রুমে ডেকে পাঠান। এরপর বলেন, “জলে বাস করতেছিস। কুমিরের সঙ্গে লড়বি কি- না বুঝে নিস। পাথরের সঙ্গে মাথা ঠোকালে পাথরের কোনো ক্ষতি হয় না। বরং যে মাথা ঠোকায় তাঁর রক্ত ঝরে।”

সিরাজের এই কথা শোনার পর ভয় পেয়ে যান মোস্তফা। তিনি বলেন, “বাইরের কাউকে জানানোর কথা চিন্তাও করিনি। আবার ভেবেছি, যার সঙ্গে ঘটনা ঘটেছে তিনি অভিযোগ না করলে আর আমি বিষয়টি জানালে বিপদে পড়ে যাবো। যদি ওই ছাত্রী পরে অস্বীকার করে। আবার হুজুরের বিষয়টি প্রমাণ করতে হলেও তো সাক্ষী লাগবে। সেটা কোথায় পাবো আমি।”

নৈশপ্রহরী মোস্তফা আরো বলেন, কয়েক বছর আগে হঠাৎ হুজুর বললেন তাঁর রুমে সাপের বাচ্চা ঢুকে পড়েছে। তখন তাঁর রুম ছিল মাদ্রাসার নিচতলায়। পাশেই ছিল পুকুর। হুজুর সবার কাছে প্রচার করেন, পুকুর থেকে সাপ এসে তার চেয়ারের নিচে বসে ছিল। অল্পের জন্য সাপের কামড় থেকে রক্ষা পান তিনি।

এটা প্রচার করার পরপরই অধ্যক্ষ জানান, তাঁর কক্ষ দোতলায় নিতে হবে। আসলে তিনি তার পাপ কাজ নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে নিরিবিলি জায়গা খুঁজছিলেন। সাপের কথা বলে সেটা পাকাপোক্ত করেন।

যেদিন তাঁর কক্ষ দোতলায় শিফট হয় সেদিন নতুন রুম দেখতে গিয়ে আবারো বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন। আরও এক ছাত্রীর সঙ্গে অশালীনভাবে তাঁকে দেখতে পান মোস্তফা। তাড়াহুড়ো করে বাইরে চলে আসেন তিনি।

মাদ্রাসার এই নৈশপ্রহরী বলেন, নুসরাত জাহান রাফির ঘটনার এক মাস আগেই মাদ্রাসায় একই ধরনের আরেকটি ঘটনা ঘটে। ওই ছাত্রীকে হুজুর ডেকে নিয়ে কুপ্রস্তাব দেন। যে ছাত্রীর সঙ্গে ঘটনাটি ঘটেছে সে নুসরাতের বান্ধবী। একই ক্লাসে তারা পড়তেন। ওই ছাত্রী হুজুরের প্রস্তাবে রাজি হননি। বিষয়টি ওই ছাত্রী বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের জানায়।

ওই ছাত্রীর বাবা সোনাগাজীতে একটি দাখিল মাদ্রাসার সুপার। পরিবারের পক্ষ থেকে তারা গভর্নিংবডির সদস্য ও মাদ্রাসা- সংশ্নিষ্ট অন্যদের কাছেও অভিযোগ দেন। তবে পরে বিষয়টি আর এগোয়নি।

মোস্তফা জানান, ‘অধ্যক্ষ সিরাজ দীর্ঘদিন ধরেই ভয়ঙ্কর পাপ করে আসছিলেন। নুসরাত সাহস করে রুখে দাঁড়িয়েছেন। জীবন দিয়ে নুসরাত অনেক মেয়ের জীবন ও ইজ্জত বাঁচিয়েছেন। তবে নুসরাত বেঁচে থাকলে খুশি হতাম। এখন খুশি হচ্ছি হুজুর ধরা পড়ায়।

এখন একটাই দাবি, যেন তাঁর উপযুক্ত বিচার হয়। আবার ভয় লাগে, ছাড়া পাওয়ার পর এসে যদি কোনো ক্ষতি করেন। তাঁর হাতে অনেক প্রভাবশালী লোকজন রয়েছেন। হুজুরের শ্যালক রাজু আছে। সে অনেক প্রভাবশালী। হুজুরের অনুগত নুর উদ্দিন, শাহাদাত ও মাকসুদ রয়েছে।’

নুসরাতের ওপর পৈশাচিক হামলার সময়কার বর্ণনা দিয়েছেন মোস্তফা। তিনি বলেন, ৬ এপ্রিল নুসরাতের ঘটনার সময় মাদ্রাসার প্রধান ফটকে দুই পুলিশ সদস্যের সঙ্গে নিরাপত্তা ডিউটি ছিল তাঁর।

ওইদিন সকাল ৭টা থেকে সোয়া ৯টা পর্যন্ত মাদ্রাসার ক্লাস চলছিল। ক্লাস শেষে আলিম পরীক্ষার্থীদের তল্লাশি করে মাদ্রাসায় ঢোকানো হচ্ছিল। মাদ্রাসা গেটে মেয়েদের তল্লাশির জন্য ছিলেন মাদ্রাসার কর্মচারি বেবী রানী।

মাদ্রাসা গেটে পৌনে ১০টার দিকে এক ছেলে এসে জানান, তাঁর বোন অসুস্থ। কেন্দ্রে ঢুকতে চান তিনি। তখন তাঁকে হল সুপারের কক্ষে নেওয়া হয়। সুপার তাঁকে জানান, তাঁর বোনের কোনো সমস্যা হলে তাঁরা দেখভাল করবেন। এরপর ওই ছেলেটি চলে যান।

১০টা বাজার কয়েক মিনিট আগে হঠাৎ এক মেয়ের আর্তনাদ কানে ভেসে আসে। দৌড়ে গিয়ে দেখেন ‘আউ আউ’ শব্দে এক মেয়ে (নুসরাত) কাঁদছেন। তার সারা শরীরে আগুন।

তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ সদস্যদের নিয়ে মোস্তফা পাপোশ দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। বদনা দিয়ে তাঁর শরীরে পানি ঢালতে থাকেন। কিছু সময় পর মেয়েটি অজ্ঞান হয়ে পড়েন।

তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিনতে পারেন, অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে যে মেয়েটি অভিযোগ এনেছিলেন সেই তরুণীই হামলার শিকার।

অধ্যক্ষ সিরাজের একান্ত বিশেষ সহকারী নুরুল আমিন জানান, ২৭ মার্চ নুসরাতকে অধ্যক্ষ তার কক্ষে ডেকে আনার নির্দেশ দেন। নুরুল আমিন অধ্যক্ষের এই তথ্য নুসরাতকে জানান।

মিনিট দশেক পরে চার বান্ধবীসহ নুসরাত অধ্যক্ষের কক্ষের সামনে আসেন। এরপর নুসরাত একাই অধ্যক্ষের রুমে ঢোকেন। তাঁর বান্ধবীরা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

নুসরাত রুমে ঢোকার মিনিট পাঁচেক পর কলিংবেল বাজান অধ্যক্ষ। এরপর রুমে ঢুকে নুরুল আমিন দেখেন, নুসরাত মাথা টেবিলের সঙ্গে লাগিয়ে বসে আছেন।

নুরুল আমিনকে অধ্যক্ষ নির্দেশ দেন- নুসরাতের কী হয়েছে তা জানতে। কয়েকবার জানতে চাইলেও জবাব না দিয়ে দৌড়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান নুসরাত।

পরে নুসরাত বিষয়টি তাঁর পরিবারকে জানান। ওই দিন মাদ্রাসায় এসে নুসরাতের ভাই ও মা তাঁকে বাসায় নিয়ে যান।

নুরুল আমিন আরো বলেন, “অধ্যক্ষের অপকর্মের কথা আগে থেকেই জানতাম। নুসরাতের ঘটনার কিছুদিন আগেই এক ছাত্রীর গায়ে হাত দিয়েছেন তিনি। তাই কোনো ছাত্রীকে ডাকা হলে একাকী তার রুমে ঢুকতে নিষেধ করতাম।

তবে কতোক্ষণ আর পাহারা দিয়ে রাখা যায়। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে অধ্যক্ষ অনেক কিছু ম্যানেজ করে নিতেন।

৩৭ বছর সোনাগাজী মাদ্রাসায় চাকরি করছি। কতোকিছু চোখের সামনে দেখেছি। জীবনের ভয়ে আর পেটের চিন্তায় বুক ফাটলেও মুখ ফুটে অনেক কথা বলতে পারিনি।’

সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আরবি বিভাগের প্রভাষক আবুল কাশেম বলেন, কয়েকবারই অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে। যাঁরা তাঁর বিরুদ্ধে মুখ খুলেছে তাঁরাই রোষানলে পড়েছে। হয়রানি ও চাকরি যাওয়ার ভয়ে সবাই চুপ করে থাকতো।

ফেনী সদর আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক শহীদ খন্দকার বলেন, ১৯৮৯ সালে সিরাজ গোবিন্দপুর ছিদ্দিকীয়া মাদ্রাসার পড়ার সময় সেখানে একটি বাড়িতে লজিং ছিলেন। ওই এলাকার বাসিন্দা শহীদ। তখন তিনি কলেজে পড়তেন। ওই সময় সিরাজ মেয়েদের কুপ্রস্তাব দিলে তাকে বেদম মারধর করে এলাকাছাড়া করা হয়।

সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ আবদুল হালিম জানান, ২০১২-১৮ সাল পর্যন্ত সোনাগাজী ফাজিল মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটিতে ছিলেন তিনি। ওই সময় অধ্যক্ষ সিরাজুলের বিরুদ্ধে ছাত্রী নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছিল। প্রভাবশালী মহলের ইন্ধনে এসব ঘটনার তদন্ত আর এগোয়নি। নুসরাত সাহস করে রুখে দাঁড়ানোয় অধ্যক্ষের বিষয়টি এখন সামনে আসছে।

সোনাগাজীর স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে ফেনী সদর উপজেলার ধলিয়া ইউনিয়নের সালামতিয়া মাদ্রাসার এক শিশুকে বলাৎকারেরও অভিযোগ উঠেছিল। এরপর তাকে সেই মাদ্রাসা থেকে বহিস্কার করা হয়।

Share