নৌযান শ্রমিকদের ১১ দফা দাবি যুক্তিযুক্ত

নৌযান শ্রমিকদের ১১ দফা দাবি যুক্তিযুক্ত

* অভিমত বিভিন্ন মহলের, দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান

ফজলুল হক শাওন
বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডাশেন যে ১১ দফা দাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য সারা দেশে ধর্মঘট ডেকেছিল সময়ের বাস্তবতায় সেই দাবিগুলো যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেন বিশিষ্টজনসহ নৌখাত সংশ্লিষ্ট একাধিক সংগঠনের নেতারা। সরকার ও নৌযান মালিকপক্ষকে শ্রমিকদের এসব দাবি অবিলম্বে মেনে নেওয়া উচিত বলেও অভিমত দেন তাঁরা।

১১ দফা দাবিতে বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন ১৬ এপ্রিল থেকে (১৫ এপ্রিল দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিট) রাজধানীসহ সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট আহ্বান করেছিল।

১১ দফা দাবির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সরকার নির্ধারিত কাঠামো অনুযায়ী মজুরি- ভাতা প্রদান; যা নৌযান মালিকরা মানছেন না বলে শ্রমিকদের অভিযোগ। ফেডারেশনের ডাকে ১৬ এপ্রিল সকাল থেকে ঢাকা নদীবন্দরের সদরঘাট টার্মিনাল অচল হয়ে পড়ে। এখান থেকে কোনো নৌপথে লঞ্চ ছেড়ে যায়নি। একইভাবে ধর্মঘটের কারণে বরিশাল থেকে ভোলা, মেহেন্দীগঞ্জসহ অভ্যন্তরীল নৌপথগুলোতেও নৌযান চলাচল বন্ধ ছিল।

মংলা বন্দর এলাকায়ও ১১ দফা দাবিতে ওইদিন সকাল থেকে শুরু হয় নৌযান (কার্গো, কোস্টার) শ্রমিকদের কর্মবিরতি। এ কর্মবিরতির ফলে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মংলাসহ সারা দেশের নৌপথে পণ্য পরিবহন বন্ধ ছিল। কার্যত নৌযান ধর্মঘটের কারণে সারা দেশেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে সব ধরনের নৌ যোগাযোগ।

তবে শ্রম প্রতিমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে ১৬ এপ্রিল রাতেই ধর্মঘট স্থগিত করা হয়। সরকার, মালিক ও শ্রমিক- ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে ৪৫ দিনের মধ্যে গ্রহণযোগ্য সমঝোতার আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট স্থগিত করে ফেডারেশন।

১৬ এপ্রিল রাতে শ্রম অধিদপ্তরে শ্রম প্রতিমন্ত্রী বেগম মুন্নুজান সুফিয়ানের সঙ্গে নৌযান মালিক ও শ্রমিকদের দীর্ঘ বৈঠকের পর এ সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে শ্রমিকদের মজুরি- ভাতাসহ অন্যান্য দাবি ৪৫ কর্মদিবসের মধ্যে মীমাংসা করতে ১৭ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী আশিকুল আলম পটল এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

এর আগে ১১ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন নৌযান শ্রমিকেরা। ১৩ এপ্রিল সকালে শ্রমিকরা মিছিল সহকারে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে উপস্থিত হন। এরপর কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. শাহ আলম ভূঁইয়ার নেতৃত্বে মিছিল শুরু হয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বাহাদুর শাহ, রায়সাহেব বাজার, ইংলিশ রোড, ফুলবাড়িয়া, গুলিস্তান, জিপিও, পল্টন মোড় হয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সমবেত হন তাঁরা।

সেখানে শাহ আলম ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী আশিকুল আলম পটলসহ অন্য নেতারা বক্তব্য দেন। এরপর ১৫ এপ্রিল দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট (কর্মবিরতি) ডাকা হয়।

বক্তারা বলেন, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১১ দফা দাবি নিয়ে সরকার, মালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পত্র দিয়ে অবহিত করার পরও কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় শ্রমিকরা কর্মবিরতির কর্মসূচি দিতে বাধ্য হয়েছে। নেতৃবৃন্দ ১৫ এপ্রিলের মধ্যে দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। তা না হলে ১৫ এপ্রিল মধ্যরাত ১২টা ১ মিনিট থেকে কর্মবিরতির ঘোষণা দেন।

সংগঠনের দপ্তর সম্পাদক প্রকাশ দত্তর সঞ্চালনায় সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সাংগঠনিক সম্পাদক চৌধুরী আফসার হোসেন, প্রচার সম্পাদক শেখ আবুল কাশেম, বাংলাদেশ লঞ্চ লেবার এসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাইদ ড্রাইভার, বাংলাদেশ লঞ্চ লেবার এসোসিয়েশন- ঢাকা আঞ্চলিক শাখার সভাপতি মালেক মাস্টার, কার্যকরী সভাপতি বাহাদুর মাস্টার, জাহাঙ্গীর আলম, বজলুর রহমান, জাকির হোসেন, সিরাজুল ইসলাম স্বপন, আব্দুর রহমান, মো. খোকন মিয়া প্রমুখ।

নৌযান শ্রমিকদের ১১ দফা
১. বাল্কহেডসহ সকল নৌযানে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও ডাকাতি বন্ধ।

২. ২০১৬ সালে ঘোষিত মজুরি কাঠামো পূর্ণ বাস্তবায়ন (যাত্রীবাহী নৌযানে)।

৩. ভারতগামী শ্রমিকদের ল্যান্ডিং পাস প্রদান ও হয়রানি বন্ধ।

৪. সকল নৌশ্রমিককে মালিক কর্তৃক খাদ্যভাতা প্রদান।

৫. এনডোর্স, ইনচার্জ ও টেকনিক্যাল ভাতা পুনর্নির্ধারণ।

৬. কর্মস্থলে ও দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণকারী শ্রমিকের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ১০ লাখ টাকা নির্ধারণ।

৭. নৌশ্রমিককে মালিক কর্তৃক নিয়োগপত্র, পরিচয়পত্র ও সার্ভিস বুক প্রদান।

৮. নৌশ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

৯. নৌপথের নাব্য রক্ষা ও প্রয়োজনীয় মার্কা, বয়া ও বিকনবাতি স্থাপন।

১০. মাস্টার/ড্রাইভার পরীক্ষা, সনদ বিরতণ, সনদ নবায়ান, পরিদর্শনসহ এ সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের সকল প্রকার অনিয়ম ও শ্রমিক হয়রানি বন্ধ এবং

১১. চট্টগ্রাম, মংলা ও পায়রা বন্দরে আউটারে চলাচলকারী শ্রমিকদের সী এলাউন্স প্রদান।

তবে শ্রমিকদের দাবিসমূহ পূরণে মালিকপক্ষ কালক্ষেপন করলেও বিশিষ্টজনেরা ১১ দফাকে সময়োপযোগী ও যুক্তিযুক্ত মনে করছেন। বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ বিশিষ্টজনেরা বলছেন, নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন অন্যায্য কোনো দাবি তোলেনি।

সৈয়দ আবুল মকসুদ
বিশিষ্ট লেখক, কলামিস্ট ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, বর্তমান দুর্মূল্যের বাজারে ন্যায্য মজুরি- ভাতা না পেলে শ্রমিকরা বাঁচবেন কীভাবে। শধ্যবিত্তরা যেখানে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে শ্রমিকেরা সামান্য মজুরিতে পরিবার- পরিজন নিয়ে কতোটা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে তা একবার ভেবে দেখা উচিত। মালিকপক্ষের উচিত অবিলম্বে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিগুলো মেনে নেওয়া।

গ্রিন ক্লাব অব বাংলাদেশ
প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিন ক্লাব অব বাংলাদেশের (জিসিবি) সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা নুরুর রহমান সেলিম বলেন, বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের ১১ দফা দাবির কোনোটিই অযৌক্তিক মনে হয়নি। এগুলোর মধ্যে কয়েকটি পূরণ করবে সরকার এবং কয়েকটি মালিকপক্ষ। নি¤œ আয়ের শ্রমিকদের জীবন- জীবিকার কথা বিবেচনা করে তাদের দাবিগুলো অবিলম্বে মেনে নেওয়ার জন্য সরকার ও মালিকপক্ষের প্রতি আহ্বান বেসরকারি এই সংগঠনের সভাপতি।

নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি
সংগঠনের সভাপতি ও পুরানো ঢাকার বিশিষ্ট সমাজসেবক হাজী মোহাম্মদ শহীদ মিয়া বলেন, নির্বিঘœ ও নিরাপদ নৌ চলাচলের স্বার্থে নৌযান শ্রমিকদের সামগ্রিক নিরাপত্তা অপরিহার্য। নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন বিভিন্ন সময়ে নৌযানে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও ডাকাতি বন্ধ করার যে দাবি তুলেছে তা যেমন শতভাগ যৌক্তিক, তেমনি মজুরি ও ভাতাসহ বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সুবিধা প্রদানের দাবিও সন্দেহাতীতভাবে অগ্রগণ্য। সময়ের বাস্তবতায় মালিকপক্ষ ও সরকার এই ১১ দফা দাবি মেনে নেবে এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সভাপতি।

Share