অপেক্ষার প্রহর শেষ হচ্ছে না নমিতা দেবীর

অপেক্ষার প্রহর শেষ হচ্ছে না নমিতা দেবীর

*সাংবাদিক-ছাত্রলীগ নেতা পার্থপ্রতিম আচার্য হত্যাকাণ্ড
*খুনিরা মুজিব কোট পরে ঘুরে বেড়ান : পার্থর মা

ফিরোজউদ্দিন
পৃথিবীর সব চেয়ে বড় বোঝা সন্তানের লাশ। যে বাবা- মা এই লাশ বহন করেছেন, কেবল তাঁরাই এর মর্মবেদনা, যন্ত্রনা ভোগ করেছেন। তেমনই এক মা সত্তরোর্ধ নমিতা দেবী; যিনি ২১ বছর এই বোঝা বয়ে চলেছেন। অকাতরে বিসর্জন দিয়ে চলেছেন অশ্রু। এ মায়ের আর্তি একটাই; তা হচ্ছে সন্তানের খুনীদের শাস্তি দেখে যাওয়া। সাংবাদিক ও সাবেক ছাত্র নেতা পার্থপ্রতিম আচার্যর গর্ভধারিনী মা তিনি।

নমিতা দেবী কয়েকবছর আগে মস্তিস্কে রক্তক্ষরণজনিত রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। সেই সঙ্গে বয়সের ভারে ন্যুজ। হাঁটাচলাও ঠিকমতো করতে পারেন না। তবু প্রতিদিন বাড়ির আঙিনায় ছেলের সমাধির পাশে যান। জলে চোখ ভিজে ওঠে। নিরবে কাঁদেন। নিজের কাছে প্রশ্ন করেন- পুত্রহত্যার ন্যায়বিচার কবে পাবেন তিনি? এ সময় কেউ তাঁকে সমবেদনা জানাতে গেলেই উচ্চস্বরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। বারবার শুধু বলেন, “’আর কতোদিন অপেক্ষা করতে হবে? কবে আমার পার্থর খুনিদের শাস্তি হবে?”

এভাবে পার হয়ে গেছে ২১টি বছর। এখনো বিচার হয়নি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা ও সাংবাদিক পার্থপ্রতিম আচার্য হত্যাকাণ্ডের। তাই আজও তাঁর মা নমিতা দেবী কাঁদেন। অপেক্ষার প্রহর গুণছেন ছেলের হত্যাকারীদের বিচার দেখে যাওয়ার।

১৯৯৮ সালের ২৩ এপ্রিলের ঘটনা। এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যয়নরত অবস্থায় ছাত্রদল ক্যাডারদের হাতে নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হয়েছিল ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য পার্থকে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হত্যাকারীরা ভোল পাল্টে এখন মুজিবকোট পরে ঘুরে বেড়ায়। অন্যদিকে, প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও পার্থর ভাই হওয়ার অপরাধে ২০০৯ সাল থেকে বিনা নোটিশে ভোগ করতে হচ্ছে সাময়িক বরখাস্তসহ বিভাগীয় শাস্তি। শাস্তির খড়গ শুধু ভাইয়ের মাথায় নয়, পার্থর স্ত্রী লিলি ভট্টাচার্যের সমস্যা সমাধানেও দলের স্থানীয় নেতারা এগিয়ে আসেননি। খবর সমকাল।

এক বিচিত্র রাজনৈতিক প্রহসন। যেখানে খুনিরাই পুরস্কৃত আর নির্যাতিতরা নিপীড়িত। ঘটনার ২১ বছর পার হলেও পার্থর মা বলতে পারেন না, হত্যাকারীদের অবস্থান কোথায়? পার্থর মৃত্যুর এক বছর পর ১৯৯৯ সালের ১২ এপ্রিল সন্তানের শোকে মারা যান তাঁর বাবা অধ্যাপক নরেশ চন্দ্র আচার্য। আর পার্থর মৃত্যুর সময় তাঁর স্ত্রী লিলি ভট্টাচার্য ছিলেন চার মাসের অন্তঃসত্বা। যখন পার্থর একমাত্র সন্তান পৃথ্বীপ্রতিম ভট্টাচার্য জন্ম নেন, তখন তিনি জানতেন না, পৃথিবীতে তাঁর বাবা বলার মানুষটি আগেই চিরতরে হারিয়ে গেছেন। পৃথ্বী এখন রাজধানীর বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি এখন সব বোঝেন। পৃথ্বীও চান, তার বাবার হত্যার বিচার হোক।

নমিতা দেবী

একমাত্র সন্তান পৃথ্বীকে ঘিরে বেঁচে আছেন পার্থর স্ত্রী লিলি ভট্টাচার্য। তিনি রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের জামালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত। লিলি বলেন, “পৃথ্বী গর্ভে যখন চার মাসের, তখন পার্থ খুন হন। এতো কষ্টের মধ্যেও মেয়েটার জন্যই বেঁচে আছি। এই পৃথিবীতে কে কার খোঁজ রাখে! মৃত্যুবার্ষিকীতে সবাই পার্থকে স্মরণ করতে আসে। তবে সারা বছর কেউ খোঁজ নেয় না। তখন মনে হয়, কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেয়ার জন্যই তারা আসে। তারপরও যতোদিন বেঁচে আছি, ততোদিন চাইবো, আমার স্বামী হত্যার বিচার হোক।”

কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে ২০০৬ সালে বালিয়াকান্দির জামালপুরে ৪ শতাংশ জমি কিনেছিলেন পার্থর স্ত্রী লিলি ও তাঁর বোন। ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ওই জমিতে বাড়ি তৈরি করে থাকছেন। কিন্তু বাড়ির সামনে জামালপুর ডিগ্রি কলেজের রাস্তা হওয়ায় লিলির বাড়ির মূল গেট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অনুরোধ করা সত্ত্বেও বাড়ি থেকে বের হওয়ার একটু জায়গা দেয়া হয়নি। ফলে ৫ মিনিটের রাস্তা এখন আধা ঘণ্টায় যেতে হয়। লিলি ভট্টাচার্য বলেন, “আমার স্বামী মারা গেছেন। আমাদের দেখার কেউ নেই। এ সমস্যা সমাধানে স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের বারবার বলেছি। কেউ সমাধান করে দেননি। অথচ আমি মারা গেলে লাশটা বের করারও উপায় নেই।”

পার্থর মায়ের কথায় জানা যায়, এক ছেলেকে হারানোর পর তাঁর আরেক ছেলে মৃদুল কুমার আচার্য ২০তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে ক্যাডার সার্ভিসের কর্মকর্তা হিসেবে হবিগঞ্জে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে যোগ দেন। পার্থর ভাই হওয়ার অপরাধেই তাঁকে পোস্টিং দেয়া হয় বান্দরবানে এবং সেখানে অর্থ আত্মসাতের মিথ্যা অভিযোগ এনে ২০০৯ সাল থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে রাখা হয়েছিল। দুই বছর পর ২০১১ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে আরো দুই বছরের জন্য ‘প্রারম্ভিক’ বেতন ধরা করা হয়। তবে এখনও ইনক্রিমেন্ট বা বেতন বৃদ্ধি বন্ধ করে রাখা হয়েছে তাঁর। ফলে মোট বেতনের অর্ধেক দিয়ে পুরো সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় মৃদুল আচার্যকে। আরেক ছেলে বিশ্বজিৎ আচার্য ভাইয়ের হত্যা মামলা নিয়ে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের লেখাপড়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তিনিও এখন ভালো নেই। এ অবস্থায় এক নিদারুণ কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছে তাঁদের।

পার্থদের বাড়ি মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলা সদরে। সেখানে থাকেন তাঁর মাসহ অন্য তিন ভাই। তিন ছেলে পাশে থাকলেও প্রায় সময়ই পার্থর কথা বলেন তিনি। নমিতা দেবী বলেন, “পার্থ দলের একনিষ্ঠ কর্মী ছিল। বেঁচে থাকতে প্রায়ই বলতো, ‘দেখো মা, আমি যদি মারা যাই, এ বাড়িতে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আসবেন’। পড়াশোনার পাশপাশি রাজনীতি ছিল তার নেশা।” জীবিকার প্রয়োজনে ছাত্রাবস্থায়ই বেছে নিয়েছিলেন সাংবাদিকতাকে। দৈনিক আজকের কাগজে কর্মরত ছিলেন পার্থ।

হিমাগারে পার্থ হত্যা মামলা
১৯৯৮ সালের ২৩ এপ্রিল পার্থ খুন হওয়ার পরদিন ২৪ এপ্রিল ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি বাহাদুর বেপারী বাদী হয়ে ছাত্রদলের সেই সময়ের নেতা শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, হাবিবুন্নবী খান সোহেল, শিমুল খান, রফিকুল আজম খান ওরফে বিপ্লব খান, ন্যাটা বাবু, জাকির, মাহবুবসহ ১৮ জনের নাম উল্লেখ করে রমনা থানায় হত্যা মামলা করেছিলেন। মামলা নং (৯৮) ৪। তখন এ মামলায় মোট ৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও পরবর্তী সময়ে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়। ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসার পর ২০০৩ সালে পার্থ হত্যা মামলা হিমাগারে চলে যায়। ২০০৪ সালে মামলা থেকে আসামিরা খালাস পান।

নমিতা দেবী অভিযোগ করে বলেন, পার্থ হত্যার আসামি শিমুল খান ও বিপ্লব খানের ভাই শফিকুল আযম খান ওরফে চঞ্চল খান আওয়ামী লীগের আশীর্বাদে মনোনয়ন পেয়ে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই ছাত্রদল নেতা বিপ্লবও ২০১২ সালে মহেশপুরে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি হন। এখন তারা মুজিবকোট পরে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সুযোগ- সুবিধা ভোগ করছেন। আর আমীরুজ্জামান খান ওরফে শিমুল খান ২০০৯ সালে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ক্রীড়া সম্পাদক থাকলেও পার্থকে হত্যা করার সময় ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া হলের ক্যাডার বেনজির আহম্মেদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

Share