জায়ানে কাঁদছে বাংলাদেশ

জায়ানে কাঁদছে বাংলাদেশ

অরুন দাস
একটি মৃত্যু যে পুরো দেশকে কাঁদাতে পারে- তার প্রমাণ অতি সম্প্রতি দেখা গেছে ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে মারার মধ্য দিয়ে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শেখ হাসিনা বার্ণ এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে পাঁচদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে হেরে যাওয়ার পর নুসরাতের জন্য গোট জাতি অশ্রুসিক্ত হয়েছিল। গভীর এই ক্ষত না শুকাতেই আবারো সমস্ত বাংলাদেশকে কাঁদালো ফুটফুটে চেহারার নিষ্পাপ শিশু জায়ান চৌধুরী।

ভারত মহাসাগর অঞ্চলের দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কায় গত ২১ এপ্রিল ঘটে যাওয়া নজিরবিহীন সন্ত্রাসী হামলায় আরো অনেকের মতো নিভে গেছে জায়ানের জীবনপ্রদীপও। ফুটফুটে শিশুটির এমন করুণ মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না কেউ। শুধু স্বজন কিংবা পরিবারের সদস্যরাই নন, জায়ানের জন্য কাঁদছে পুরো দেশ। জায়ানের মৃত্যুসংবাদ শোনার পর রাজধানীর বনানীতে তার নানা আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য শেখ সেলিমের বাসায় সমবেদনা জানাতে ছুটে গেছেন সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠনের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীরা।

ওই হামলার ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন জায়ানের বাবা মশিউল হক চৌধুরী প্রিন্সও। তাকে ভর্তি করা হয়েছে কলম্বোর একটি হাসপাতালে। হামলার সময় ঘটনাস্থলে না থাকায় প্রাণ বেঁচেছেন জায়ানের মা শেখ আমেনা সুলতানা সোনিয়া এবং ছোটভাই জোহান চৌধুরী।

পারিবারিক সূত্র জানায়, গত ১৮ এপ্রিল বাবা- মা ও ছোট ভাইয়ের সঙ্গে শ্রীলঙ্কা বেড়াতে গিয়েছিলো জায়ান। তাঁরা উঠেছিলেন কলম্বোর পাঁচতারকা হোটেল সাংগ্রি লায়। ২১ এপ্রিল সকালে ইস্টার সানডের প্রার্থনার সময় কলম্বোর গির্জা, অভিজাত হোটেলসহ যে আটটি স্থানে বোমা বিস্ফোরণ ঘটে; তার মধ্যে সাংগ্রি লা হোটেলও রয়েছে। বোমা বিস্ফোরণের সময় হোটেলের নিচতলার রেস্তোরাঁয় নাশতা করতে গিয়েছিলো রাজধানী ঢাকার সানবিম ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের কেজি-২ শ্রেণির ছাত্র জায়ান। ছোট ছেলে জোহানকে নিয়ে শেখ সেলিমের মেয়ে সোনিয়া তখন হোটেলকক্ষে অবস্থান করছিলেন। বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থলেই মারা যায় জায়ান। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তার খোঁজ মেলেনি। বিস্ফোরণে গুরুতর আহত জায়ানের বাবা প্রিন্সকে দ্রুত উদ্ধার করে কলম্বোর একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

২১ এপ্রিল সন্ধ্যায় ব্রুনাইয়ের রাজধানী দারুস সালামে প্রবাসী বাঙালিদের দেয়া এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শ্রীলঙ্কায় বোমা হামলায় অসংখ্য হতাহতের ঘটনায় শোক ও উদ্বেগ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, শেখ সেলিমের মেয়ে ও জামাই দুই বাচ্চা নিয়ে শ্রীলঙ্কায় ছিলেন। সেখানে মেয়ের জামাই প্রিন্স ও সাড়ে আট বছর বয়সী ছেলে (জায়ান) গিয়েছিলো রেস্টুরেন্টে। সেখানে বোমা পড়েছে। জামাই আহত হয়ে হাসপাতালে। বাচ্চাটার এখনো কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছে না যে, সে কোথায় আছে। সবাই দোয়া করেন, যেন ওকে পাই।

এর আগে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এক ব্রিফিংয়ে জানান, বোমা হামলার ঘটনার পর থেকে এক শিশুসহ দুই বাংলাদেশির খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তবে তাদের নাম- পরিচয় তখন তিনি প্রকাশ করেননি।

দিনভর খোঁজাখুঁজির পর ২১ এপ্রিল রাতেই বিস্ফোরণস্থল থেকে জায়ানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। শেখ সেলিমের বনানীর বাড়িতে তাঁর মামাতো ভাই শেখ অলিদুর রহমান হীরা এ তথ্য জানিয়ে সাংবাদিকদের জায়ানের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন।
২২ এপ্রিল তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক তার ফেসবুকে জায়ানের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দেয়া পোস্টে লিখেছেন, “আদুরে জায়ান দেখা হলেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘দাদু’ বলে জড়িয়ে ধরতো।” একাধিক সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রীয় সফরে ব্রুনাইয়ে অবস্থানরত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রিয় নাতির মৃত্যুসংবাদ শুনে অঝোরে কেঁদেছেন। জায়ানের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর তিনি কিছুক্ষণের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন।

জায়ান চৌধুরীর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ জানিয়েছে বিভিন্ন দল ও সংগঠন। পৃথক শোক বিবৃতিতে এসব সংগঠনের নেতারা জায়ানের রুহের মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। শোক জানিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ আলম, জাকের পার্টির চেয়ারম্যান পীরজাদা মোস্তফা আমীর ফয়সল, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এনডিপি) চেয়ারম্যান খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজা, মহাসচিব মঞ্জুর হোসেন ঈসা, যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ।

Share