ট্যাক্সিচালক থেকে আ.লীগ সভাপতি রুহুল

ট্যাক্সিচালক থেকে আ.লীগ সভাপতি রুহুল

  • মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যা

  • রাজনৈতিক উত্থান ও অপকর্ম নিয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদন

রফিকুল ইসলাম মন্টু
ফেনীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার পর আলোচনায় উঠে এসেছেন সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন। চাঞ্চল্যকর এ মামলায় গ্রেপ্তারের পর একের পর এক বেরিয়ে আসছে তার রাজনৈতিক উত্থান, ক্ষমতার দাপট ও অপরাধের নানা তথ্য। গ্রেপ্তার হয়ে পুলিশ রিমান্ডে যাওয়া রুহুল আমিন ফেনীর সোনাগাজী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির (সদ্যবিলুপ্ত) সহসভাপতি। দীর্ঘদিন ধরে সোনাগাজীতে নানা অনৈতিক কর্মকা- চালিয়ে আসছিলেন তিনি।

গত ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামীয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ- উদ- দৌলার বিরুদ্ধে নুসরাত শ্নীলতাহানির অভিযোগ আনার পরপরই ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেন রুহুল। ওইদিনই সোনাগাজী উপজেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক খুরশিদ আলম ভূঁইয়া ও পৌর কাউন্সিলর বিএনপি নেতা মো. ইয়াছিনকে নিয়ে মাদ্রাসায় গিয়ে বিষয়টি মিটমাট করতে বৈঠক করেছিলেন তিনি। বিভিন্ন সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

১৯ এপ্রিল পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) হাতে গ্রেপ্তারের পর প্রথম দফায় পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে তাকে। এ সময়ে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন তিনি। তবে হত্যা পরিকল্পনায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।

এদিকে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা রুহুল আমিনের রাজনৈতিক উত্থান থেকে শুরু করে নুসরাতের ঘটনায় ভূমিকা নিয়ে ইতোমধ্যে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। সেখানে তার সম্পর্কে উঠে এসেছে নানা চমকপ্রদ তথ্য। এ ছাড়া গণমাধ্যমকর্মীদের পক্ষ থেকে সোনাগাজীতে খোঁজ নিয়ে তাঁর নানা অপকর্মের কাহিনী পাওয়া গেছে।

রুহুল আমিন পেশায় একজন ট্যাক্সিচালক ছিলেন। দেশে- বিদেশে ট্যাক্সি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। আগে জাতীয় পার্টির রাজনীতি করতেন। সোনাগাজী উপজেলা জাতীয় পার্টির সদস্য ছিলেন। এরশাদের পতনের পর বিএনপি ক্ষমতায় আসলে ভিড়ে যান বিএনপিতে। সেখান থেকে ১৯৯৭ সালে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ওই বছর সোনাগাজী ফরিদ সুপার মার্কেটের সামনের এক সমাবেশে উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ফয়েজুল কবিরের হাতে ফুল দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন তিনি। এরপরই ধীরে ধীরে দলটির উপজেলার শীর্ষ পদ দখল করেন তিনি। খবর ইউএনবি, সমকাল ও আমাদের সময়।

স্থানীয় ও অন্যান্য সূত্র মতে, রুহুল আমিন সোনাগাজী উপজেলার চরচান্দিয়া ইউনিয়নের কেরানিবাড়ির কোরবান আলীর ছেলে। কোরবান একসময়ে জাহাজের শ্রমিক ছিলেন। ছেলে রুহুল আমিন পড়াশোনায় পঞ্চম শ্রেণির গ-ি পার করতে পারেননি। জাতীয় পার্টি, বিএনপি হয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন ১৯৯৭ সালে। সৌদি আরবে অবস্থান করেন ২০০১ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত। সেখানেও ট্যাক্সি চালাতেন তিনি। সৌদিতে থাকাকালীন গোপনে আবারো বিএনপি- জামাতের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। অনেক দেনদরবার করে ২০১৩ সালে ফের সোনাগাজী আওয়ামী লীগের সদস্য হন। এরপর ২০১৬ সালে ফেনীর প্রভাবশালী সাংসদ ও আওয়ামী লীগ নেতা নিজাম হাজারীর আশির্বাদে সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হন। একপর্যায়ে দলীয় কাউন্সিল ছাড়াই ২০১৮ সালে ভারমুক্ত হয়ে সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বনে যান।

অধ্যক্ষ সিরাজের পোষ্য বাহিনী মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতের গায়ে আগুন লাগানোর পর রুহুল আমিনকে ফোনে ‘কাজ হয়ে যাওয়ার’ ম্যাসেজ জানায়। এ সময় রুহুল বলেন, ‘আমি জানি। তোমরা পালিয়ে যাও। আমি থানায় যাচ্ছি। রহুল আমিনের এমন নির্দেশের পর ঘটনাস্থল থেকে তাদের সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলযোগে সরিয়ে নেওয়া হয়।

পিআইবি’র হাতে উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি রুহুল আমিনের এমন নির্দেশের ৬ সেকেন্ডের একটি অডিও বার্তা রয়েছে।

পিবিআিই জানায়, নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার পর এ ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে প্রচারের চেষ্টা চালানো হয়। এটি সমন্বয় করেন থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেন ও রুহুল আমিন। সহযোগিতা করেন উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম। আর টাকার যোগান দেন অধ্যক্ষের স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার। তাদেরই একটি সিন্ডিকেট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে প্রচার করা এবং নিজেদের আইডি থেকে অপপ্রচার চালানোর দায়িত্ব পায়।

পিবিআই সূত্র আরো জানায়, অর্থের যোগানের জন্য ঘটনার আগের দিন অর্থাৎ ৫ এপ্রিল মাদ্রাসার ভেতরের পুকুর থেকে মাছ ধরে বাজারে এক লাখ ২৫ হাজার টাকা বিক্রি করেন রুহুল আমিন ও মাকসুদ আলম।

উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক সৈয়দ দ্বীন মোহাম্মদ বলেন, ১৯৯৭ সালে অওয়ামী লীগে যোগদানের পর চার বছর দলীয় কোনো কার্যক্রমে অংশ নেয়নি রুহুল আমিন। ২০০১ সালে চলে যান সৌদি আরব। সেখানে ট্যাক্সি চালাতেন। ২০০৯ সালে সোনাগাজী ফিরে আসেন। ২০১৩ সালে উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনের আগে ৪৪ নম্বর কাউন্সিলর মনোনীত হন।

২০১৫ সালে রুহুল আমিন অনেকটা আকস্মিকভাবে সোনাগাজী ছাবের পাইলট হাইস্কুলের পরিচালনা কমিটির সভাপতি মনোনীত হন। সৈয়দ দ্বীন মোহাম্মদ অভিযোগ করেন, রুহুল আমিন ও তার লোকজন জোর করে ওই পদটি দখল করে নেয়।

২০১৫ সালে জেলা আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতার টেন্ডারবাজি ও অনিয়ম দুর্নীতির বিরোধিতা করায় হঠাৎ রহিম উল্লাহকে বাদ দিয়ে ১ নম্বর সহসভাপতি করা হয় রুহুল আমিনকে। এরপর ২০১৭ সালে ফয়জুল কবীর চিকিৎসাধীন থাকার সুযোগে প্রথমে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হন রুহুল আমিন।

সৈয়দ দ্বীন মোহাম্মদ বলেন, ‘২০১৮ সালের শুরুতে উপজেলা আওয়ামী লীগের এক সভায় রুহুল আমিনকে প্রথমে উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয়। জাতীয় নির্বাচনের আগে কোনো কাউন্সিল ও দলীয় রেজুলেশন ছাড়াই নিজেকে সভাপতি ঘোষণা দেন রুহুল আমিন। আর এসবের নেপথ্যে ছিল জেলা আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতা।’

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ফয়জুল কবির বলেন, ‘আমি পদ থেকে পদত্যাগও করিনি, আবার আমাকে বাদও দেয়া হয়নি। আমি অসুস্থতার কারণে দলীয় কার্যক্রমে অংশ নিতে পারছি না। তাহলে অন্য কেউ কিভাবে এ পদে এলেন, তা বোধগম্য নয়।’

ফয়জুল কবির বলেন, দলের উপজেলা কমিটির সভাপতি হওয়ার পর রুহুল আমিন ও তার লোকজন সাবেক সাংসদ হাজী রহিম উল্যাহর লোকজনের নিয়ন্ত্রণে থাকা ছোট ফেনী নদীর মুহুরী প্রকল্প অংশের বালুমহাল ও সাহেবের ঘাট এলাকার বড় বালুমহাল দখল করে নেন। এখনো এ দুটি বালুমহালে কয়েক কোটি টাকার বালু রয়েছে।

সোনাগাজী ইসলামীয়া সিনিয়র মাদ্রাসার একাধিক সূত্র জানায়, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সোনাগাজী পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শেখ মামুন ওই মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন। কিন্তু ছয় মাস আগে নানা কৌশলে শেখ মামুনকে বাদ দিয়ে রুহুল আমিন সদস্য মনোনীত হন। এর কিছুদিনের মধ্যেই তিনি সহসভাপতি বনে যান। নানা অপকর্ম ঢাকতে এবং নিজের প্রভাববলয় বাড়াতে বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ- উদ- দৌলা নিজে রুহুলকে সদস্য হওয়ার সুযোগ করে দেন।

অভিযোগ রয়েছে, মাদ্রাসার মার্কেটের ১২টি দোকান, ভেতরের বিশাল পুকুরের মাছ চাষ ও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নানা উপায়ে আদায় করা বাড়তি টাকারও ভাগ পেতেন রুহুল আমিন ও আরেক সদস্য ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদ আলম। এই ক্যাম্পাসের বাইরেও মাদ্রাসার রয়েছে জমিসহ কোটি টাকার সম্পদ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাদ্রাসার একজন শিক্ষক জানান, সিরাজ তাদের প্রায়ই বলতেন, ‘শোনো, রুহুল- মাকসুদ এরা সবাই অশিক্ষিত। এরা থাকলে দুই রকম সুবিধা, একদিকে এরা কোনো বিষয়ে উচ্চবাচ্য করবে না। আবার সব সময় আমাদের পক্ষেও থাকবে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের স্থানীয় একাধিক নেতা অভিযোগ করেন, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সদস্য আবুল কালাম বাহারকে গলা কেটে হত্যার চেষ্টা করে রুহুল আমিন ও তার ক্যাডাররা। সোনাগাজী সদর ইউনিয়ন যুবলীগ নেতা স্বপন, চরদরবেশ ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হোসেন আহমেদ, মতিগঞ্জ ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান লিটনসহ অনেকেই বিভিন্ন সময় হামলা- মারধরের শিকার হয়েছে। অনুগত না হওয়ায় বাদ দেয়া হয় পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আবসার ও উপজেলা আওয়ামী লীগের উপ- তথ্য সম্পাদক আবদুর রহিম খোকনকে।

পিবিআই জানায়, নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যা মামলার আসামি নুর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীমের ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দিতে ১৩ থেকে ১৪ জনের নামে উঠে আসলেও ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২৫- ২৬ জন জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর এ হত্যাকা-ের সঙ্গে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনের সম্পৃক্ততার কথা এখন অনেকটা নিশ্চিত।

Share