নদী রক্ষায় ১০ বছরের মহাপরিকল্পনা

নদী রক্ষায় ১০ বছরের মহাপরিকল্পনা

অমরেশ রায়
নদ-নদীসহ দেশের প্রাকৃতিক পানিসম্পদ রক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের যে অঙ্গীকার আওয়ামী লীগ বিশেষ করে দলটির সভপতি শেখ হাসিনা করেছিলেন, তা ধাপে ধাপে দ্রুততার সঙ্গে পূরণ করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় রাজধানী ঢাকার চারপাশের নদীগুলো ছাড়াও চট্টগ্রামের কর্র্ণফুলী দখল ও দূষণমুক্ত করে নাব্য ফেরাতে ১০ বছর মেয়াদী একটি মহাপরিকল্পনার খসড়া চূড়ান্ত করেছে সরকার। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

প্রসঙ্গত, ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনের আগে ১৪ দলের প্রধান শরিক আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে বিলুপ্ত ও বেদখল হওয়া নদ- নদীগুলোকে পুনরুদ্ধার, প্রয়োজনীয় খননের মাধ্যমে বিলুপ্ত নৌপথ পুনরুদ্ধার করে নাব্য ফিরিয়ে আনা এবং অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের কথা বলা হয়েছিল। নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর প্রতিশ্রুতি পূরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ বছরে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) মাধ্যমে দেড় হাজার কিলোমিটার (কিমি) নৌপথ খনন করে সচল করা হয়েছে। দেশজুড়ে নদী খনন কাজ চলমান রয়েছে। হাতে নেওয়া হয়েছে ১৭৮টি নদী খনন পরিকল্পনা। খুব শিগগির শুরু হতে যাচ্ছে ব্রহ্মপুত্র খনন কাজ।

সূত্র মতে, এসব নদী খনন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ১০ বছরে ২৮টি আধুনিক ড্রেজার ক্রয় করেছে বিআইডব্লিউটিএ। আরো ৩৫টি ড্রেজার ক্রয়ের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এছাড়া নদীগুলো রক্ষার জন্য নদীতীরে বাঁধ দিয়ে ওয়াকওয়ে নির্মাণ, সাধারণ মানুষের বিনোদন ও পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন স্থানে নদীতীরে ইকোপার্ক নির্মাণসহ নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার।

এলজিআরডি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৭ এপ্রিল সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত নদী সংক্রান্ত জাতীয় টাস্কফোর্সের সভায় নদ-নদী রক্ষায় ১০ বছরের একটি মহাপরিকল্পনার খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। সভা শেষে নিজ দপ্তরে এলজিআরডিমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, “উন্নত বাংলাদেশ গড়তে হলে গ্রাম- গঞ্জের সকল মানুষের কাছে উন্নয়নের সব সুবিধা পৌঁছে দিতে হবে। তেমনিভাবে নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীগুলোকে দূষণমুক্ত করতে হবে, নাব্য ফিরিয়ে আনতে হবে।”

প্রসঙ্গত, নদ-নদীগু দখল ও দূষণমুক্ত করে নাব্য ফেরাতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গঠিত এই টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান হলেন এলজিআরডিমন্ত্রী।

মো. তাজুল ইসলাম বলেন, “টাস্কফোর্স এরই মধ্যে একটি খসড়া মাস্টার প্ল্যান (মহাপরিকল্পনা) করেছে, সেই মাস্টার প্ল্যানের ওপর আলোচনা করে আজ (১৭ এপ্রিল) নীতিগতভাবে অনুমোদন করেছি। একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে সভায়।” মন্ত্রী জানান, তারা অনুমোদিত এই খসড়া এখন প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করবেন।

এলজিআরডিমন্ত্রী আরো বলেন, “এ বিষয়ে উনার (প্রধানমন্ত্রী) অনেক আন্তরিকতা, এটার বিষয়ে তিনি অনেক গুরুত্ব দেন, সেই হিসেবে নিজস্ব অনেক তথ্য জানা আছে। যদি কোথাও ইনপুট দেয়া দরকার মনে করেন, সংযোজন করা দরকার মনে করেন, সেটা করবেন।”

মহাপরিকল্পনায় কী আছে জানতে চাইলে তাজুল ইসলাম বলেন, এই মাস্টার প্ল্যানকে ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’, ‘স্বল্প মেয়াদী’, ‘মধ্যমেয়াদী’ এবং ‘দীর্ঘ মেয়াদী’ পরিকল্পনায় ভাগ করা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্যমাত্রা ১০ বছর। প্রাথমিকভাবে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চলছে। আপনারা দেখছেন নদী দখলমুক্ত করা হচ্ছে, ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হবে। এরপর ওয়াসার নেতৃত্বে স্যানিটেশনের কাজ শুরু হচ্ছে। দূষিত পানি যেন নদীতে না যায় সেজন্য ঢাকার স্যুয়ারেজ লাইনও ঠিক করার কথা রয়েছে এই মহাপরিকল্পনায়।”

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, “বর্জ্য নিয়ে আমরা কাজ করছি। বর্জ্য যাতে নদীতে এখানে- সেখানে ডাম্প করা না হয় সেজন্য বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা নিতে কাজ করছি।”

নাব্য ফিরিয়ে আনতে ১০ বছরের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করার কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, “নদীতে ড্রেজিং করতে হবে। পলি পড়ে নদীর বেডগুলো (তলদেশ) উঁচু হয়ে গেছে, সেগুলোকে আগের জায়গায় নিতে হবে। পানি দূষিত হয়ে গেছে, পানি ট্রিট (পরিশোধন) করতে হবে। পানিতে আর যাতে দূষিত পদার্থ না যায় সেজন্য সোর্সগুলো (উৎস) বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি গৃহস্থালী ও শিল্পবর্জ্য যাতে আর নদীতে না যায়, সেই ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও পরিকল্পনায় রয়েছে। বর্জ্য সংগ্রহ করে আমরা ডিসপোজাল করে দেবো।”

মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কতো টাকা লাগবে তা ওয়ার্কিং গ্রুপ নির্ধারণ করবে বলে জানান মন্ত্রী।

তাজুল ইসলাম আরো বলেন, “ওয়ার্কিং গ্রুপ কাজগুলো ভাগ করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেবে। ইতোমধ্যে সেই কাজ শুরু হয়ে গেছে।”

উল্লেখ্য, রাজধানী ঢাকার চারপাশ দিয়ে প্রবাহিত বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরীসহ দেশের সকল নদ- নদী ও উন্মুক্ত জলাশয় রক্ষায় উচ্চ আদালত যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন্। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে এ সংক্রান্ত নির্দেশনাও দিয়েছেন আদালত। কিন্তু নদীগুলোকে আজও দখল ও দূষণমুক্ত করা যায়নি। এমনকি দখল ও দূষণ বন্ধও করা যাচ্ছে না।

এই প্রেক্ষাপটে গত মার্চে এক রিটের রায়ে হাইকোর্ট ঢাকার তুরাগ নদকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণা করে দেশের সকল নদ- নদী, খাল- বিল ও জলাশয়কে রক্ষার জন্য জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে ‘আইনগত অভিভাবক’ ঘোষণা করেন। ইতিহাসে ‘মাইলফলক’ ওই রায়ে নদী দখলকারীদের নির্বাচন করার ও ঋণ পাওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।

আদালত তাঁর রায়ে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন যাতে নদ- নদী, খাল- বিল ও জলাশয় রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে, সেজন্য আইন সংশোধন করে ‘কঠিন শাস্তির’ ব্যবস্থা করতে বলেছেন সরকারকে।

এর পাশাপাশি জলাশয় দখলকারী ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণকারীদের তালিকা প্রকাশ, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দেশের সব নদ- নদী, খাল- বিল ও জলাশয়ের ডিজিটাল ডেটাবেইজ তৈরি এবং সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প কারখানায় নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি নিতে বলা হয় হাই কোর্টের রায়ে।

নৌ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের সিদ্ধান্তে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে দখলমুক্ত করার কাজ শুরু করেছে বিআইডব্লিউটিএ। প্রথম পর্যায়ে শুরু হয়েছে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগতীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যক্রম। দীর্ঘ প্রায় তিন মাস ধরে এই অভিযান চলছে।

Share