নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতায় ফেরা কঠিন

নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতায় ফেরা কঠিন

শান্তনু দে
ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত বালাকোটে হামলার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা একলাফে পৌঁছেছিল শীর্ষে। রেটিং ছিল ৬২ শতাংশ। প্রথম দফার ভোটের পরেই বদলে গিয়েছে পরিস্থিতি। পুলওয়ামার পর মোদি হাওয়া তৈরির যে চেষ্টা হয়েছিল, তা কাজ করেনি। জনপ্রিয়তার হার নেমে এসেছে ৪৩ শতাংশে। পাঁচ সপ্তাহে পতন প্রায় ১৯ শতাংশ।

পাঁচ বছর আগে মোদির পক্ষে আর কংগ্রেসের বিরুদ্ধে হাওয়া ছিল বেশ কিছু রাজ্যে। উত্তর প্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তিশগড়, ঝাড়খন্ড, হরিয়ানা, দিল্লি, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখন্ড ও গুজরাটে। ৩১ শতাংশ ভোটে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজেপি যে ২৮২টি আসন পেয়েছিল, তার অধিকাংশই এসেছিল এই রাজ্যগুলো থেকে। এই ১১টি রাজ্যেই ২৪৮টি আসন থেকে বিজেপি জিতেছিল ২১৬টি। তাক লাগিয়ে দেয়া স্ট্রাইক রেট, ৮৭ শতাংশ।

একই ফল এবার কোনোভাবেই হবে না। কারণ, উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, রাজস্থান, বিহার, ঝাড়খন্ড ও দিল্লিতে বিজেপি তার জমি হারিয়েছে। বেশির ভাগ জনমত সমীক্ষাই বলছে, এই সব রাজ্য থেকে বিজেপি হারাতে চলেছে ৪০-৫০ শতাংশ আসন। যদি ধরেও নিই, এই ১১টি রাজ্য থেকে বিজেপি গড়ে ৫০-৬০ শতাংশ আসন ধরে রাখতে পারবে, তাহলেও দল হারাবে ৯০ থেকে ১০০টি আসন।

কে না জানে, উত্তর প্রদেশের ৮০টি আসনই দিল্লির ক্ষমতার অন্দরমহলে প্রবেশের চাবি। গতবার বিজেপি একাই জিতেছিল ৭১টি আসনে। শরিক আপনাদল পায় ২টি আসন। মায়াবতীর বিএসপি আর অখিলেশ যাদবের এসপি উভয়ের কাছেই বিজেপি ছিল প্রধান শত্রু। তবু তারা জোট করেনি। উল্টো প্রচারের সময় একে অপরকে আক্রমণ করেছিল। বিজেপিবিরোধী ভোট ভাগাভাগি দিয়ে শেষ হয় লড়াই। মায়াবতীর শিকেয় জোটেনি একটি আসনও। সমাজবাদী পার্টি পায় সাকুল্যে পাঁচটি আসন। বাকি দুটি পায় কংগ্রেস। অথচ বিএসপি-এসপি জোট করে লড়লে কেন্দ্রভিত্তিক হিসাব বলছে, তারা পেতো অন্তত ৪১টি আসন। আর এই জোটে যদি কংগ্রেস যোগ দিতো, তাহলে তিনটি দল মিলিয়ে পেত ৫৭টি আসন।

এবার উত্তর প্রদেশে এক নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি। মায়াবতী আর বিলেতের ‘বুয়া-ভাতিজা’র জোট। শুরু থেকেই কংগ্রেস খেলছে ফ্রন্টফুটে। রাজনীতিতে রাহুল নামিয়েছেন বোন প্রিয়াঙ্কাকে। রাহুলের সঙ্গে বেহেন (প্রিয়াঙ্কা) আছেন। আসলে থাকা দরকার ছিল বেহেনজির (মায়াবতী)। প্রিয়াঙ্কার রাজনীতিতে প্রবেশে কংগ্রেস কতোটা লাভ তুলতে পারবে, সময় বলবে। তবে বিরোধীদের বাড়া ভাতে জল ঢেলে দেয়ার আশঙ্কা দিব্যি রয়েছে। ভালো ব্যাটসম্যান সেই, যে বল ছাড়তেও জানে। কংগ্রেস ১৬- ১৮টির বেশি আসনে আন্তরিকভাবে লড়ছে না। বাকি কেন্দ্রগুলোতে কংগ্রেসের প্রতীকী উপস্থিতি বিএসপি- এসপির কাছে আদৌ কোনো হুমকি না। বছরখানেক আগেই গোরখপুর ও ফুলপুর উপনির্বাচনে কংগ্রেস প্রায় তার জামানত খোয়াতে বসেছিল। বিএসপি-এসপির গাঁটবন্ধন কাজ করেছিল দস্তুরমতো। যদি তার পুনরাবৃত্তি হয়, তবে অধিকাংশ আসনে কংগ্রেস ক্ষতি করবে সামান্য। আর যদি এসপি- বিএসপি এবং কংগ্রেসের মধ্যে কৌশলগত বোঝাপড়া হয়, কেউ যদি কারো জমিতে আঘাত না হানে, তাহলে লাভ করবে বিরোধীরা। এতে বিজেপির দুই দিক থেকেই লোকসান। একদিকে হারাবে দলিত ও ওবিসির ভোট, যা পাবে এসপি- বিএসপি। অন্যদিকে হারাবে ব্রাহ্মণ ও ঠাকুরের ভোট, যে ভোটের অনেকটা যাবে কংগ্রেসে।

যা-ই হোক, যেমনই হোক, কোনোভাবেই গতবারের মতো ৭১ হচ্ছে না। রক্ষণশীল সমীক্ষাও বিজেপিকে অর্ধেক আসন দিচ্ছে না। প্রথম দফা ভোটের কয়েকদিন আগে ভারতের প্রথম সারির সমীক্ষক সংস্থা সিএসডিএসের সমীক্ষা জানিয়েছিল, বিজেপি জিততে পারে ৩২-৪০টি আসনে। আর প্রথম দফায় রাজ্যে আটটি আসনে নির্বাচনে ভোটদানের হার দেখে সংস্থার অধিকর্তার পূর্বাভাস, এই প্রবণতা থাকলে বিজেপি ২০-২৫টির বেশি পাবে না।

হিন্দিবলয়ে গত ডিসেম্বরেই রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়- তিন রাজ্যে বিজেপি শোচনীয়ভাবে হেরেছে। সাম্প্রতিক প্রবণতা হলো লোকসভা ভোটের আগে বিধানসভা ভোটে যে দল জয়ী হয়, তারাই জেতে সাধারণ নির্বাচনে। ১৯৯৯- এ রাজস্থানের ব্যতিক্রম বাদে গত চারবারের নির্বাচনে এমনই দেখা গিয়েছে।

বিহারে পাঁচ বছর আগে ৪০টির মধ্যে ৩১টি আসনে লড়ে বিজেপি জিতেছিল ২২টি। এবার লড়ছে প্রায় অর্ধেক, ১৭টি আসনে। মানে জেতা আসন থেকেও ছেড়ে দিতে হয়েছে পাঁচটি। আর এতেই স্পষ্ট, পায়ের তলার জমি কতোটা আলগা, ব্র্যান্ড মোদির বাজার কতোটা পড়তির দিকে।

দক্ষিণ ভারত বিজেপির কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। দক্ষিণের পাঁচ রাজ্য- অন্ধ্র প্রদেশ, তেলেঙ্গানা, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, কেরালা এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পদুচেরি মিলে ১৩০ জন সাংসদকে পাঠায় লোকসভায়। ২০১৪- তে তুমুল মোদি হাওয়া সত্ত্বেও বিজেপি পেয়েছিল সাকল্যে ২০টি আসন। স্ট্রাইক রেট মাত্র ১৫ শতাংশ। যার মধ্যে ১৭টি কর্ণাটক থেকে, ২টি অন্ধ্র আর ১টি তামিলনাড়ু থেকে। তেলেঙ্গানা, কেরালা, পদুচেরিতে খাতা খুলতে পারেনি।

কর্ণাটকে কংগ্রেস- জনতা দলের (সেক্যুলার) প্রাক-ভোট আসন বোঝাপড়া হওয়ায় বিজেপির গতবারের সাফল্য ধরে রাখা কঠিন। তামিলনাড়ুতে এডিএমকের সঙ্গে আসন রফা হলেও বিজেপির তেমন লাভ না হওয়ারই কথা। তখন জয়ললিতা ছিলেন। এবার নেই। এই পাঁচ বছরে এডিএমকে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ- অসন্তোষ বেড়েছে। তেলেঙ্গানায় বিজেপি কোনো জোটে নেই। রাজনৈতিক শক্তিও নেই। অন্ধ্রে গতবার চন্দ্রবাবু নাইডুর তেলেগু দেশমের জোট করে ২টি আসন পেলেও এবার সেই সম্ভাবনা নেই। জোট হয়নি তেলেগু দেশমের সঙ্গে। কেরালায় সবরমতী মন্দিরে মহিলাদের প্রবেশে বাধা দিয়ে রাজ্যে প্ররোচনা তৈরি করলেও তিরুবনন্তপুরম ছাড়া তেমন কোথাও লড়াই দিতে পারবে না।

আসামের ১৪টি বাদে গোটা উত্তর-পূর্ব মিলিয়ে ১১টি আসন। বিরাট ভালো ফল করলেও গোটা দেশের লোকসান পূরণ করা কঠিন। তা ছাড়া নাগরিকত্ব বিল নিয়ে ক্ষোভে ফুঁঁসছে গোটা উত্তর-পূর্ব।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ‘চমকে দেয়ার মতো ফল করবে’ বলে বাজার গরম করার চেষ্টা চলেছে। এর ১ নম্বর কারণ যদি হয় তৃণমূলের বিরুদ্ধে অসন্তোষ, আর ২ নম্বরে মুকুল রায়ের দল ভাঙনের খেলা, তাহলে ৩ নম্বর অবশ্যই গত আট বছর বেপরোয়া ভোট লুটে তৃণমূল নিজেও জানে না তার পক্ষে প্রকৃত সমর্থনের হার কতো? অমিত শাহ ‘লক্ষ্য’ ঠিক করে দিয়েছেন ২৩। বাস্তব পরিস্থিতি কী?

পশ্চিমবঙ্গে ২০১১- তে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ভোটের হার ছিল ৪ শতাংশ। ২০১৪- তে বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ শতাংশ। ২০১৬- তে বিধানসভা নির্বাচনে কমে দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৬ শতাংশ, পায় তিনটি আসন। এই তিন বছরে বিজেপি কী এমন করেছে, ১০ শতাংশ একলাফে বেড়ে ৩৫ শতাংশ বা ৩০ শতাংশ হবে?

সব মিলিয়ে এবার নরেন্দ্র মোদির রাষ্ট্রক্ষমতায় ফেরা রীতিমতো এক কঠিন চ্যালেঞ্জ।
শান্তনু দে : কলকাতার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

Share