শ্রীলঙ্কায় ধর্মীয় উৎসবে রক্তবন্যা

শ্রীলঙ্কায় ধর্মীয় উৎসবে রক্তবন্যা

গির্জা ও হোটেলে জঙ্গিদের আত্মঘাতী সিরিজ বোমা হামলা
নারী-শিশুসহ সাড়ে ৩ শতাধিক নিহত, আহত ৫ শতাধিক
নিহতের তালিকায় এক বাংলাদেশিসহ ৩৬ বিদেশি নাগরিক

অরুন দাস
দফায় দফায় বোমা হামলায় রক্তবন্যা বয়ে গেলো দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কায়। ২১ এপ্রিল সকালে খ্রিষ্টানদের পবিত্র ইস্টার সানডের দিনে একযোগে তিনটি হোটেল ও তিনটি গির্জায় ছয়টি বোমা বিস্ফোরণের পর বিকালে আরেকটি হোটেলসহ দুই স্থানে বোমা হামলা হয়েছে। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ ঘটনায় ৩৫৯ জনের প্রাণহানির তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। আহত হয়েছেন পাঁচ শতাধিক। নিহতদের মধ্যে এক বাংলাদেশিসহ ৩৬ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।

এছাড়া নিখোঁজ রয়েছেন বেশকিছু লোক; যাদের মধ্যে বাংলাদেশিও আছেন। হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে শ্রীলঙ্কা কর্তৃপক্ষ। ঘটনার তিন দিন পর হামলার দায় স্বীকার করেছে সিরিয়া- ভিত্তিক আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটস (আইএস)।

নজিরবিহীন হামলার পরের দিন ২২ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে শ্রীলঙ্কায় জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। ২৩ এপ্রিল নিহতদের স্মরণে জাতীয় শোক দিবস পালন করা হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় ২০০৯ সালে ২৬ বছরের গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এটিই সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী হামলা। এ ঘটনায় শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে দেশটির মানুষ। আত্মঘাতী হামলাকারীরা সবাই শ্রীলঙ্কার নাগরিক বলে দেশটির সরকার জানিয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্নেষকরা একে ‘অভিনব ধরনের সন্ত্রাসী হামলা’ বলে মত দিয়েছেন। হামলার ১০ দিন আগেই পুলিশ এ বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য পেয়েছিলো। এ ঘটনা সামনে আসতেই দোষারোপের রাজনীতি শুরু হয়েছে। উঠে আসছে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যর্থতার কথাও।

শ্রীলঙ্কা সরকার বলছে, স্থানীয় ন্যাশনাল তাওহিদ জামাত (এনটিজে) এ হামলা চালিয়েছে বলে তাদের ধারণা। তবে তারা আন্তর্জাতিক কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সহায়তা পেয়েছে। এ ঘটনায় আটক করা হয়েছে সন্দেহভাজন ২৪ জনকে।

এদিকে শ্রীলঙ্কায় সিরিজ বোমা হামলার তিন দিন পরও হামলাকারীর পরিচয় পরিষ্কার হয়নি।

সরকারের পক্ষ থেকে যাদের ওপর দোষ চাপানো হচ্ছে, সেই ‘ন্যাশনাল তাওহিদ জামাত’ (এনটিজে) এখনো হামলার দায় স্বীকার করেনি। কেউ বলছে, নিউজিল্যান্ডের মসজিদে হামলার ‘প্রতিশোধ’ নিতেই শ্রীলঙ্কায় হামলা হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সিরিয়া-ভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটস (আইএস) দায় স্বীকার করেছে বলেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে। কোনো কোনো গণমাধ্যমে আবার ‘জামাাত আল- তৌহিদ আল-ওয়াতানিয়া’ নামের একটি সংগঠনের কথাও বলা হচ্ছে। ‘আমাক’কে আইএসের মুখপত্র উল্লেখ করে এসব গণমাধ্যম বলছে, নিজেদের সংবাদ সংস্থার মাধ্যমে আইএস হামলার দায় স্বীকার করে নিয়েছে।

গত ২৩ এপ্রিল তিন মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে নিহতদের স্মরণ করে শ্রীলঙ্কার মানুষ। স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৮টায় শুরু হয় এই নীরবতা। ২১ এপ্রিল সাড়ে ৮টার সময়ই সিনামোন গ্র্যান্ড হোটেলে প্রথম হামলাটি হয়েছিলো।
২৩ এপ্রিল শ্রীলঙ্কাজুড়ে একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হয়। সব ভবনে জাতীয় পতাকা ছিলো অর্ধনমিত। নিহতদের অনেকের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

নৃশংস এ হামলার পর দেশবাসীকে শান্ত থাকার অনুরোধ জানিয়েছেন শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা। তদন্তকাজে তিনি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চেয়েছেন।

এরপরই ইন্টারপোল ও এফবিআই তদন্তে সহযোগিতার ঘোষণা দিয়েছে। সিরিসেনা বলেছেন, স্থানীয় সন্ত্রাসীদের বিদেশি সন্ত্রাসীরা মদদ দিয়েছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তদন্ত কাজে সহায়তা করার জন্য দেশবাসীর প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

হামলা তদন্তে সুপ্রিম কোর্টের এক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেুৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছেন প্রেসিডেন্ট। ঘটনার পরপরই জরুরি সভা ডেকেছেন প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে।

প্রেসিডেন্ট সিরিসেনার মিডিয়া উইং জানায়, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়তে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এক্ষেত্রে মত প্রকাশের স্বাধীনুায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা হবে না।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিশ্বনেুারা এ হামলায় শোক ও নিন্দা জানিয়েছেন। বর্বরোচিত এই হামলার নিন্দা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডেন, জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে, পোপ ফ্রান্সিসসহ আরো অনেকে।

বর্বরোচিত এ হামলার জন্য বেছে নেওয়া হয় খ্রিষ্টানদের খুবই আনন্দের ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন ইস্টার সানডেকে। বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতো শ্রীলঙ্কার খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীরাও দিনটি শুরু করেছিলেন উৎসবমুখর পরিবেশে। এ উপলক্ষে গির্জায় সমাগম ঘটেছিলো বহু মানুষের। এ অবস্থায় ২১ এপ্রিল স্থানীয় সময় সকাল পৌনে ৯টায় রাজধানী কলম্বো থেকে ২০ মাইল উত্তরের শহর নেগোম্বোতে সেন্ট সেবাস্তিয়ান চার্চে প্রথম হামলা চালানো হয়। এরপর একে একে আরো দুটি গির্জা ও তিনটি হোটেলে পালাক্রমে বোমা হামলা চালানো হয়। মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে ভয়াবহ এসব বোমা হামলায় ভারত মহাসাগরের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটি পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে। এরপর আরো দুটি বোমা হামলা হয়। এগুলোর বেশিরভাগই আত্মঘাতী হামলা ছিলো বলে জানিয়েছে পুলিশ।

হামলার শিকার হয়েছে দেশটিতে ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের তিনটি বড় গির্জা সেইন্ট অ্যান্থনি চার্চ, সেইন্ট সেবাস্টিয়ান চার্চ ও জিয়ন চার্চ। হামলার অন্যতম লক্ষ্য ছিলেন কলম্বোর পাঁচতারকা হোটেল সাংগ্রি লা, কিংসবারি আর সিনামন গ্র্যান্ডের বিদেশি পর্যটকরা।
এর মধ্যে উনিশ শতকের শুরুতে নির্মিত কোচিকাডের সেইন্ট অ্যান্থনি গির্জা শ্রীলঙ্কার একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। খ্রিষ্টানদের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের কাছেও এটি আকর্ষণীয় জায়গা।

এছাড়া কাটুয়াপিতিয়ার সেইন্ট সেবাস্টিয়ান চার্চ এবং বাত্তিকালোয়ার জিয়ন গির্জাও শ্রীলঙ্কায় ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের গুরুত্বপূর্ণ দুটি উপাসনালয়। বিস্ফোরণে প্রতিটি গির্জাই মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ছাদ উড়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসা ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায়, বিধ্বস্ত গির্জাগুলোর বেঞ্চ আর যিশুর ভাস্কর্যে রক্তের দাগ লেগে আছে।

কামাল নামের এক প্রত্যক্ষদর্শী বিস্ফোরণের শব্দ শোনার পর দৌঁড়ে সেইন্ট অ্যান্থনির চার্চে গিয়ে মেঝেতে মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। তিনি বলেন, আমরা দৌঁড়ে গির্জার ভেতরে গিয়ে মরদেহ পড়ে থাকতে দেখলাম। আমরা প্লাস্টিক দিয়ে সেগুলো ঢেকে দিলাম।

এরপর পুলিশ এসে সবাইকে সেখান থেকে বের করে দেয়। প্রায় একইসময়ে বিস্ফোরণ হয় কলম্বোর সাংগ্রি লা, সিনামন গ্র্যান্ড ও কিংসবারি হোটেলে। প্রতিটি হোটেলের রেস্তোরাঁয় তখন সকালের নাশতা সারতে আসা পর্যটকের ভিড় ছিলো। সেই পর্যটকরাই ছিলো আত্মঘাতী হামলাকারীদের টার্গেট।

শ্রীলঙ্কায় বেড়ে ওঠা ৪৮ বছরের চিকিৎসক জুলিয়ান ইমানুয়েল পরিবার নিয়ে থাকেন যুক্তরাজ্যে। আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করতে কলম্বো এসে তারা উঠেছিলেন সিনামন গ্র্যান্ড হোটেলে।

তিনি বলেন, “বিকট বিস্ফোরণের সময় আমরা হোটেলের ঘরেই ছিলাম। বিস্ফোরণের শব্দে আমাদের ঘর কেঁপে ওঠে। পরে আমাদের হোটেলের লাউঞ্জে নিয়ে এসে পেছন দিক দিয়ে পালিয়ে যেতে বলা হলো। সেখানে আমরা কয়েকজন হতাহতকে দেখতে পেলাম। তাদের তখন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো।”
সকালের নাশতা খেতে যেতে সামান্য দেরি হওয়ায় প্রাণে বেঁচে যান লন্ডন বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক কিরণ আরাসারতত্নম।

তিনি বলেন, এতো জোরে শব্দ হয়েছিলো যে আমি বজ্রপাত ভেবেছিলাম। সবাই আতঙ্কে ছোটাছুটি শুরু করে। বেশিরভাগ মানুষ বুঝতে পারেনি, আসলে কী হয়েছে। লোকজনের শার্টে রক্ত লেগে ছিলো, ছোট একটা মেয়েকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলছিলো; দেয়াল, মেঝে রক্তে ভেসে যাচ্ছিলো।

একের পর এক অ্যাম্বুলেন্সে করে হতাহতদের নেওয়া হচ্ছিলো হাসপাতালে। স্বেচ্ছাসেবীদের আহ্বানে বহু মানুষ ততোক্ষণে রক্ত দিতে ভিড় করেছেন ব্লাডব্যাংকে। বোমা হামলার পর সন্ধ্যা থেকে পুরো শ্রীলঙ্কায় জারি করা হয়েছিলো কারফিউ। ২২ এপ্রিল সকালে তা তুলে নেওয়া হয়েছে।

বোমা হামলায় সাতজন আত্মঘাতী হামলাকারী অংশ নিয়েছিলো বলে জানান শ্রীলঙ্কা সরকারের ফরেনসিক বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আরিয়ানন্দ ওয়েলিয়াঙ্গা। ২২ এপ্রিল তিনি বলেন, কলম্বোর বিলাসবহুল সাংগ্রি লা হোটেলে দুই হামলাকারী বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মঘাতী হয়। অন্য হামলাকারীরা তিনটি গির্জা ও অন্য দুইটি হোটেল লক্ষ্য করে হামলা চালায়। ওয়েলিয়াঙ্গা বলেন, এ ঘটনায় এখনো তদন্ত চলছে।

আগেই সতর্ক করেছিলো দেশটির পুলিশ
সিরিজ বোমা হামলার মাত্র ১০ দিন আগে দেশটির পুলিশপ্রধান হামলা হতে পারে আশঙ্কায় দেশকে সতর্ক করেছিলেন। রাজধানী কলম্বোয় ভারতের হাইকমিশনেও আগাম সতর্কবার্তা পাঠানো হয়।

শ্রীলঙ্কার পুলিশপ্রধান পুজুথ জয়সুন্দর গত ১১ এপ্রিল দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে গোয়েন্দা সতর্কবার্তা পাঠিয়েছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী শ্রীলঙ্কায় আরো হামলার ষড়যন্ত্র করছে। সন্ত্রাসীরা সামান্য সতর্কতা বা কোনো ধরনের সতর্কতা ছাড়াই হামলা চালাতে পারে। হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে পর্যটন স্থান, পরিবহনের কেন্দ্রস্থল, বিপণিবিতান, হোটেল, উপাসনালয়, বিমানবন্দর ও অন্যান্য জনবহুল স্থান।

শ্রীলঙ্কার মন্ত্রিসভার মুখপাত্র রাজিথা সেনারতেœ বলেছেন, দেশটির সরকার মনে করছে, স্থানীয় উগ্র ইসলামপন্থি দল এনটিজে ভয়াবহ এ আত্মঘাতী হামলায় জড়িত। আন্তর্জাতিক কোনো গোষ্ঠী এনটিজেকে সমর্থন বা সহযোগিতা করেছে কি- না, এ নিয়ে সরকারের তদন্ত চলছে। সেনারত্নে বলেছেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি না, দেশের ভেতরের কোনো গোষ্ঠী এ হামলা চালিয়েছে। হামলায় আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক জড়িত। আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ছাড়া এ ধরনের হামলা সফল হতো না।’ গত বছর একটি বুদ্ধমূর্তি গুঁড়িয়ে দেয়ার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে এনটিজের নাম খবরে এসেছিলো।

হামলায় নিহতের বেশিরভাগই শ্রীলঙ্কার নাগরিক। এছাড়া বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য, ভারত, ডেনমার্ক, চীনসহ আরো কয়েকটি দেশের নাগরিকরা আছেন তালিকায়। যুক্তরাজ্যের আটজন মারা গেছেন। ডেনমার্কের শীর্ষ ধনী অ্যান্ডারস হচ পভ্লসেনের চার সন্তানের তিনজনই হামলায় মারা গেছেন। নিহতদের মধ্যে ভারতের সাত- আটজন রয়েছেন বলে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে। আছেন তুরস্কের দুই নাগরিক। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন তার দেশের দুই নাগরিকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।

হামলায় নিহত প্রতেক্যের পরিবারকে ৪৮ হাজার টাকা করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে শ্রীলঙ্কা সরকার। আহতদের চিকিৎসার খরচ এবং ক্ষতিগ্রস্ত গির্জা পুরোপুরি মেরামত করে দেয়া হবে বলে ২২ এপ্রিল জানিয়েছেন মন্ত্রিসভার মুখপাত্র সেনারত্নে
২২ এপ্রিল সেইন্ট অ্যান্থনি গির্জার সামনে থাকা একটি গাড়িতে বোমা বিস্টেম্ফারণের ঘটনা ঘটে। পুলিশ বোমাটি নিস্ক্রিয় করার সময় সেটি বিস্ফোরিত হয়। তবে এতে কেউ হতাহত হয়নি। এছাড়া কলম্বোর বাস্তিয়ান মাওয়াথা বাসস্টেশনে ৮৭টি ডেটোনেটর (বোমার যে অংশটি প্রথমে বিস্ফোরিত হয়ে মূল বোমাকে বিস্ফোরিত করে) পেয়েছে পুলিশ।

হামলায় এনটিজের নাম আসার পর শ্রীলঙ্কার মুসলিমরা নতুন করে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। কলম্বোতে মুসলিম সংগঠন ন্যাশনাল শুরা কাউন্সিলের নেতা আজমান আবদুল্লাহ টেলিফোনে বলেন, আতঙ্কের পাশাপাশি মুসলিমরা ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত।

সোশাল মিডিয়ায় কড়াকড়ি
শ্রীলঙ্কার পুত্তালুম জেলায় ২১ এপ্রিল রাতে অন্তত একটি মসজিদে পেট্রোল বোমা হামলা চালানো হয়েছে। এছাড়া বান্দারাগামা এলাকায় মুসলিম মালিকানাধীন দুটি দোকানে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। হামলা নিয়ে গুজব ছড়ানো বন্ধ করতে সেখানে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপসহ সামাজিক যোগাযোগের জনপ্রিয় মাধ্যমগুলোও বন্ধ রাখা হয়েছে। গতি কমিয়ে দেয়া হয়েছে ইন্টারনেটেরও। এছাড়া নিরাপত্তার স্বার্থে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ সব রুটে প্লেন চলাচল স্থগিত করেছে কর্তৃপক্ষ।

স্তম্ভিত শ্রীলঙ্কাবাসী
শ্রীলঙ্কায় বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে নির্বিচারে হামলা চালাতো তামিল গেরিলারা। উত্তর- পূর্বাঞ্চলে ‘তামিল ইলাম’ নামে আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৮৩ সাল থেকে সশস্ত্র বিদ্রোহ চালিয়ে আসা সংগঠন এলটিটিই’র গেরিলাদের প্রধান ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণকে ২০০৯ সালে হত্যার মধ্য দিয়ে তাদের দমন করা হয়। প্রায় এক দশক পরে এমন বর্বর কায়দায় হামলা দুঃস্বপ্নের মতো সামনে এসে দাঁড়িয়েছে শ্রীলঙ্কাবাসীর। তারা বলছেন, তারা ভেবেছেন সহিংসতা হয়তো শ্রীলঙ্কায় অতীত হয়েছে। কিন্তু এই ট্র্যাজেডি তাদের বিমর্ষ করে দিয়েছে।

৪৮ বছর বয়সী চিকিৎসক এমানুয়েল বলেন, সিনামোন গ্র্যান্ড হোটেলে যখন একটি বোমা বিস্ফোরণ হয়, তখন আমি আমার স্ত্রী- সন্তানসহ ওই হোটেলের কক্ষেই অবস্থান করছিলাম। সাড়ে ৮টার দিকে এই বিস্ফোরণে ভয় পেয়ে আমরা হোটেল লাউঞ্জে দৌঁড়ে যাই। তখন আমাদের সেখান থেকে সরে যেতে বলা হয়। দেখলাম, সামনে দিয়ে রক্তাক্ত মানুষদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, সিংহলিজ ও তামিল জনগোষ্ঠীর জাতিগত বিভাজনের কারণে শ্রীলঙ্কা দশকের পর দশক ধরে জ্বলেছে। কিন্তু ২০০৯ সালের পর আমরা অপেক্ষাকৃত শান্তিতেই ছিলাম। সেজন্য আমরা ভেবেছিলাম যে, সংঘাত-সহিংসতা অতীত হয়েছে। কিন্তু এসব ফিরতে দেখে খুব খারাপ লাগছে।

গত বছরের মার্চে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর বৌদ্ধদের হামলার পর দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছিলো। শ্রীলঙ্কার মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ বৌদ্ধ, ১২ শতাংশ হিন্দু, ১০ শতাংশ মুসলিম ও বাকিরা অন্যান্য ধর্মাবলম্বী।

বিশ্বনেতাদের নিন্দা
বর্বরোচিত এ বোমা হামলার নিন্দা জানিয়েছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নিন্দা জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানও। একইসঙ্গে নিন্দা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøালাদিমির পুতিন, জার্মানির চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মেরকেল, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজসহ নেদারল্যান্ড, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ ও জোটের প্রধানরা।

হামলাকারী কারা
শ্রীলঙ্কায় বর্বরোচিত হামলায় স্থানীয় একটি উগ্রপন্থি ইসলামী গোষ্ঠী জড়িত বলে দেশটির কর্মকর্তারা দাবি করছেন। এ হামলার জন্য স্থানীয়ভাবে অল্প পরিচিত ন্যাশনাল তাওহিদ জামাত (এনটিজে) দায়ী বলে মনে করছে শ্রীলঙ্কার সরকার। ফলে তদন্তকারীরা এখন এই সংগঠনটির প্রতি বিশেষভাবে নজর দিচ্ছেন। কর্মকর্তারা বলছেন, তারা স্বল্প পরিচিত নতুন একটি গোষ্ঠী, যাদের সম্পর্কে কিছুদিন আগেও তেমন একটা জানা ছিলো না। কিছুদিন আগে একটি বুদ্ধ ভাস্কর্য ভাঙার ঘটনার সঙ্গে এরা জড়িত ছিলো বলে ধারণা করা হয়। ২২ এপ্রিল জামাত আল- তাওহিদ আল- ওয়াতানিয়া নামে একটি জঙ্গিগোষ্ঠী হামলার দায় স্বীকার করেছে। তবে সংগঠনটির নাম আগে শোনা যায়নি।

বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছড়ানোর অভিযোগে ২০১৬ সালে এনটিজের নেতা আবদুল রাজিককে গ্রেপ্তারের পর প্রথম এটি আলোচনায় আসে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এনটিজে ইসলামপন্থি সন্ত্রাসী ধ্যান- ধারণা লালন করে। শ্রীলঙ্কার স্থানীয় সংবাদমাধ্যম বলছে, এই গোষ্ঠীটি কাট্টাকুডি নামে একটি মুসলিম অধ্যুষিত শহরে ২০১৪ সালে গঠিত হয়। এর আগে কোনো মারাত্মক হামলা চালানোর সঙ্গে তাদের নাম শোনা যায়নি। তবে দলটি তথাকথিত ইসলামিক স্টেটস (আইএস) গ্রুপকে সমর্থন করতো বলে জানা যাচ্ছে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের শ্রীলঙ্কাবিষয়ক পরিচালক অ্যালান কিনানের ধারণা, এই গোষ্ঠী গত বছরের ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনায় জড়িত ছিলো। তিনি বলেন, গত ডিসেম্বরে মারওয়ানেলা শহরে গৌতম বুদ্ধের কয়েকটি মূর্তি ভাঙচুর করা হয়েছিলো। এরপর পুলিশ কয়েক তরুণকে গ্রেপ্তার করে। তারা একজন ধর্ম প্রচারকারীর ছাত্র ছিলো বলে বলা হয়েছে। তবে ১০ দিন আগে এনটিজের দ্বারা গির্জায় হামলার ব্যাপারে বন্ধুপ্রতিম একটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থা শ্রীলঙ্কার পুলিশকে সতর্ক করে দিয়েছিলো বলে দেশটির স্থানীয় গণমাধ্যম জানায়। ফলে তদন্ত কর্মকর্তাদের মনোযোগ এখন এনটিজের দিকেই বেশি পড়েছে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ রোহান গুনারত্নে বলেছেন, ইসলামিক স্টেট গ্রুপের শ্রীলঙ্কার শাখা হচ্ছে ওই ছোট সংগঠনটি, যারা চরমপন্থিদের হয়ে লড়াই করতে সিরিয়া আর ইরাকেও গিয়েছিলো। তবে শ্রীলঙ্কার সরকার বা বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, বোমা হামলাগুলোর সঙ্গে স্থানীয় গ্রুপ জড়িত থাকলেও তারা ইসলামিক স্টেট অথবা আল কায়দার মতো আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীর সহায়তা পেয়েছে। এরই মধ্যে এ হামলাকে সমর্থন করে আইএস জানিয়েছে, নিউজিল্যান্ডে মসজিদে হামলা ও সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবেই এ হামলা হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে মেলালে দেখা যায়, ইসলামিক স্টেট ও আল কায়দার সঙ্গে এসব হামলার মিল রয়েছে। মনে হয় না, শুধু স্থানীয়রা এটি ঘটিয়েছে। সম্ভবত বিদেশি গোষ্ঠী এর সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে ভারত বা পাকিস্তান থেকে লোকজন আসতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শ্রীলঙ্কার একজন জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, হামলাকারীদের বিশেষ অভিযানে দক্ষ কমান্ডার রয়েছে। হামলায় জড়িত আন্তর্জাতিক চক্রের সদস্যদের ধরতে অন্যান্য দেশের সহায়তা চেয়েছেন শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা।

দায় স্বীকার করলো আইএস
শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার দায় স্বীকার করেছে ইসলামিক স্টেটস (আইএস)। ২৩ এপ্রিল আইএসের মুখপাত্র আমাক থেকে হামলার দায় স্বীকার করা হয়। তবে এই দাবির সপক্ষে কোনো প্রমাণ দেয়নি আইএস।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে আইএসের হামলার দায় স্বীকারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এর আগে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা দাবি করেছিল, শ্রীলঙ্কায় হামলার ধরনের সঙ্গে আইএসের হামলার ধরনের মিল রয়েছে।
২৩ এপ্রিল সকালেই পার্লামেন্টে দেশটির প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী রুয়ান বিজেবর্ধনে দাবি করেন, নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে গুলি চালানোর ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই শ্রীলঙ্কায় ইস্টার সানডে উদযাপনের সময় একের পর এক বোমা হামলা চালানো হয়। শ্রীলঙ্কান দুটি ইসলামিক গ্রুপ এই হামলার সঙ্গে যুক্ত বলেও জানিয়েছেন তিনি।

হামলার ঘটনার আগে একটি গোয়েন্দা সংস্থার স্মারকে বলা হয়, সন্ত্রাসী দলের একজন সদস্য তাঁর সামাজিক যোগাযোগের অ্যাকাউন্টে চরমপন্থী বিষয়ক বিভিন্ন লেখা পোস্ট করতে শুরু করেছিলেন।

সন্ত্রাসবাদ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, এ ধরনের গভীর ও জটিল হামলা চালাতে যে সরঞ্জাম লাগে, এর প্রস্তুতিতে কয়েক মাস সময় দরকার। এর মধ্যে আত্মঘাতী সদস্য জোগাড় করা ও বিস্ফোরকদ্রব্য পরীক্ষার মতো বিষয়ও রয়েছে।
সূত্র : বিবিসি, রয়টার্স, এএফপি, সিএনএন, আলজাজিরার ও নিউইয়র্ক টাইমস।

Share