সহিংসতামুক্ত পৃথিবী চাই

সহিংসতামুক্ত পৃথিবী চাই

শ্রীলঙ্কার রক্তবন্যা

সমস্যা যখন সংকটে রূপ নেয়, তা নিরসনে সকলের সম্মিলিত প্রয়াস যে অপরিহার্য সে প্রমাণ আরেকবার বিশ্ববাসীকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো শ্রীলঙ্কায় ঘটে যাওয়া পৈশাচিকতা।

নিউজিল্যান্ডের দুটি মসজিদে বন্দুকধারীর নৃশংস হামলায় অর্ধশতাধিক প্রাণহানির মাত্র এক মাসের মাথায় শ্রীলঙ্কায় তিনটি গির্জা ও তিনটি হোটেলসহ আটটি স্থানে ভয়াবহ বিস্ফোরণে সাড়ে তিন শতাধিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনা আমাদের শুধু বেদনাহত করেনি, পৈশাচিক এ হত্যাযজ্ঞে আমরা ক্ষুব্ধ ও বিস্মিতও হয়েছি। বেদনা ও বিক্ষোভের কারণ সহজেই অনুমেয়।

সাপ্তাহিক পাঠকের কন্ঠর পক্ষ থেকে আমরা হতাহতদের জন্য গভীর শোক এবং তাদের পরিবার ও স্বজনের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।

আমরা বিস্মিত হচ্ছি এই কারণে যে, সন্ত্রাসীরা কতোটা নৃশংস হতে পারে! শিশু, নারীসহ নিরপরাধ এতো মানুষের নির্বিচারে প্রাণ নিতে তাদের কি এতোটুকু মানবতাবোধ কাজ করেনিা! আমাদের মনে আছে, নিউজিল্যান্ডের হত্যাযজ্ঞ থেকে অল্পের জন্য বেঁচে যাওয়া বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে আমরা শ্রীলঙ্কায় অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট টিমের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলাম। কে জানতো, সেই শ্রীলঙ্কাই হবে সন্ত্রাসীদের পরবর্তী নিশানা! আমরা জানি, শ্রীলঙ্কা আড়াই দশকের বেশি সময় জাতিগত সহিংসতায় ভুগেছে। কিন্তু ২১ এপ্রিলের হত্যাযজ্ঞে আট শতাধিক মানুষ হতাহত হওয়ার ভয়াবহতার সঙ্গে তার তুলনা হতে পারে না। বোমা বিস্ফোরণের পর একটি গির্জার ভেতরের দৃশ্য সম্পর্কে এক প্রত্যক্ষদর্শী নিউইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, ‘সেখানে যেন রক্তের নদী বয়ে চলছিল। নদী যেমন সাগরে মেশে, তেমনই শ্রীলঙ্কার এই রক্তের নদী বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের অন্যান্য দেশকেও স্পর্শ করতে বাধ্য। হতাহতদের মধ্যে বাংলাদেশের নাগরিকও রয়েছেন, আমরা জানি। তাদের মধ্যে জায়ান চৌধুরী নামের আট বছরের এক নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যু গোটা বাংলাদেশকে কাঁদিয়েছে। শ্রীলঙ্কার ঘটনায় আমাদের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক ও নিন্দা প্রকাশের মধ্য দিয়ে গোটা জাতির অবস্থানই প্রতিফলিত হয়েছে। আমরা দেখেছি, সন্ত্রাসবাদীরা বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন পরিচয় সামনে রেখে হত্যাযজ্ঞ চালায়। প্রকৃতপক্ষে তাদের একটিই পরিচয়। তা হচ্ছে- তারা মানবতার শত্রু। যে ধর্মীয় বা জাতিগত ঝাণ্ডাই তারা তুলে ধরুক না কেনো, সন্ত্রাসী ছাড়া তাদের আর কোনো পরিচয় থাকতে পারে না। আমরা মনে করি, এ পরিস্থিতিতে বিশ্ব-সম্প্রদায়কে একযোগে কাজ করতে হবে। একে অপরকে দোষারোপের প্রবণতা এবং পরস্পরের মধ্যে বিভক্তি কেবল সন্ত্রাসীদেরই শক্তিশালী করবে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের ধর্মীয় বা রাজনৈতিক পরিচয় যেন ওই সম্প্রদায়ের সবাইকে সামাজিক ঘৃণা ও নির্যাতনের শিকারে পরিণত না করে, সে ব্যাপারেও দেশটির সতর্কতা কাম্য। আমরা জানি, সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় বাংলাদেশের দক্ষতা ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাপি প্রশংসিত হয়েছে। শ্রীলঙ্কার এই বিপদের সময় প্রতিবেশী হিসেবে কারিগরি সহায়তা নিয়ে দেশটির পাশে দাঁড়াতে পারি আমরা। একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে যে, সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা নিয়ে আত্মতুষ্টিরও কোনো অবকাশ নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যদিও বলেছেন, শ্রীলঙ্কার মতো হামলার ঝুঁঁকি আমাদের দেশে নেই; তবুও সর্বোচ্চ নজরদারি ও সতর্কতা জারি রাখতেই হবে। আমরা দেখছি, মধ্যপ্রাচ্যের ভয়ঙ্কর জঙ্গিগোষ্ঠী তাদের স্বঘোষিত ‘খেলাফত’ হারিয়ে এখন বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে। শ্রীলঙ্কার হামলার সঙ্গে তার যোগসূত্র আছে কি- না তা নিয়ে প্রথম থেকে জল্পনা- কল্পনাও চলছিল। তবে ঘটনার তিন দিনের মাথায় ২৩ এপ্রিল মধ্যপ্রাচ্যের সিরিয়াভিত্তিক আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) এ হত্যাকা-ের দায় স্বীকার করেছে। তাই ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশকেও যে তারা হামলার নিশানা করবে না, এ ধরনের হামলায় তারা মরিয়া হয়ে উঠবে না- এমন নিশ্চয়তা কেউ-ই দিতে পারবে না। সুতরাং এ ব্যাপারে বিশ্বনেতাদের সন্ত্রাসবিরোধী ঐকমত্যে পৌঁছানোর কোনো বিকল্প নেই।

Share